Saturday, January 29, 2011

সময় কি ? ইসলাম কি বলে?


Time and tide wait for none. সময় ও নদীর স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। বাক্যটি ক্ষুদ্র হলেও ব্যাপক অর্থবোধক। এটি একটি বাস্তব সত্য। মানুষ এতে খুঁজে পায় তার জীবনের মূল্য। এ বাক্যটি মানব জীবনে কেবল আগ্রহ-উদ্দীপনা ও প্রেরণা জাগায় শুধু তা-ই নয়, বরং এটি একজন মানুষকে দান করে নতুন জীবন। সময়ই তার জীবন। এর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ জান্নাতের সুউচ্চ আসনে পৌঁছতে পারে। অপরদিকে এর প্রতি অবহেলা করে সে নিক্ষিপ্ত হয় জাহান্নামের অতল দেশে। তাই সময়ের মূলতত্ত্ব ও গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন মনে করছি।

সময় কী ?
বড় বড় দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা সময়ের মূলতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা-পর্যলোচনা করেছেন। বিখ্যাত দার্শনিক আবুল আলা বলেন: কাল বলতে আমরা মাত্র তিনটি দিনই বুঝি। গতকাল, আজ ও আগামীকাল। কিন্তু আজ বলতে আমাদের নিকট কিছু আছে কী? এ তো অতীত ও ভবিষ্যতের সংযোগস্থল, যার কোন স্থায়ীত্ব নেই। এর গতি এত দ্রুত যে, একে মোটেও আয়ত্বে রাখা যায় না। অতীতকাল তো পূর্ব থেকেই হাত ছাড়া, আর ভবিষ্যতের কোন নিশ্চয়তা নেই। অতএব, মানুষ কিভাবে কাজ করবে? তাকে যে জীবনে অনেক বড় হতে হবে। এগিয়ে যেতে হবে শত সহস্র বাঁধা-বিঘ্ন পেরিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্য পানে। তাই জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত কাজে লাগানো অত্যাবশ্যক।
সময়ের নিজস্ব বক্তব্য :
আল্লামা সুয়ূতী রহ. “জামউল জাওয়ামে” নামক গ্রন্থে একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: প্রতিনিয়ত সূর্যোদয়ের সাথে সাথে “দিন” এই বলে ঘোষণা করতে থাকে যে, যদি কেউ কোন ভাল কাজ করতে চায়, তাহলে যেন সে তা করে নেয়। কেননা আমি কিন্তু আর ফিরে আসবো না। আমি ধনী-দরিদ্র, ফকির-মিসকীন, রাজা-প্রজা সকলের জন্য সমান। আমি বড় নিষ্ঠুর। আমি কারো প্রতি সদয় ব্যবহার করতে শিখিনি। তবে আমার সাথে যে সদ্ব্যবহার করবে সে কখনও বঞ্চিত হবে না।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে সময় :
পৃথিবীর শুরু লগ্ন থেকেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র সবকিছুকে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে পরিচালনা করে আসছেন। সূর্য প্রতিনিয়ত একটি নির্দিষ্ট সময়ে উদিত হয়। আবার নির্দিষ্ট সময়ে অস্ত যায়। সময়ের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে একাধিক স্থানে দিবা-রাত্রির কসম করেছেন। কোথাও সকালের, কোথাও চাশতের সময়ের, আরার কোথাও আসরের সময়ের। শরীয়তের প্রতিটি হুকুম আহকামের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেও দেখতে পাই, ইসলাম প্রতিটি কাজের একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে। নামাজ, রোজা, হজ ,যাকাত ইত্যাদি বড় বড় আহকাম ছাড়াও অধিকাংশ বিষয়সমূহ সময়ের মালায় গাঁথা। এরশাদ হচ্ছে :
إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا ﴿103﴾
নিশ্চয় নামাজ মুসলমানদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফরজ করা হয়েছে। (সূরা নিসা : ১০৩)
হাদীসের আলোকে সময় :
সময়ের মর্যাদা, জীবনের গুরুত্ব, উহার অনুভূতি ও গঠনমূলক জীবন গড়ার প্রতি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন সময় বিচিত্র ভঙ্গিমায় ইঙ্গিত করেছেন। প্রসিদ্ধ গ্রন্থকার আবু দাউদ রহ. স্বীয় কিতাবে ৪৮০০ (চার হাজার আটশত) হাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন। তা থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রমাণস্বরূপ চারটি হাদিস নির্বাচন করেছেন। তার মধ্যে একটি এই,
من حسن إسلام المرء تركه ما لا يعنيه
কোন ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হলো অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করা।
অন্য এক হাদীসে এরশাদ হচ্ছে -
اغتنم خمساً قبل خمس، حياتك قبل موتك، وشبابك قبل هرمك، وصحتك قبل مرضك، وغناك قبل فقرك، فراغك قبل شغلك.
পাঁচটি বস্তু আসার পূর্বে পাঁচটি বস্তুকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করো। মৃত্যুতর পূর্বে জীবনকে, বার্ধক্যের পূর্বে যৌবনকে, অসুস্থ হওয়ার পূর্বে সুস্থতাকে, দরিদ্রতার পূর্বে সচ্ছলতাকে এবং ব্যস্ততার পূর্বে অবসরতাকে।
ইমাম বুখারী রহ. রেকাক অধ্যায়ে ও ইমাম তিরমিজি রহ. যুহদ অধ্যায়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এরশাদ উল্লেখ করেছেন : দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোকাপ্রাপ্ত। একটি হলো সুস্থতা আর অপরটি অবসরতা। সুস্থার মর্যাদা তখনই বুঝা যায়, যখন অসুস্থতার পাহাড় মাথায় চেপে বসে। দ্বিতীয় প্রকার নেয়ামতের কথা ঐ সকল লোকের নিকট জিজ্ঞেস কর, যারা সামান্য সময় অবসর পাওয়ার জন্যে ব্যাকুল। আবু বকর রা. এই দুআ করতেন: হে আল্লাহ আমাদেরকে কঠিন বিপদে ঠেলে দিও না, আর পাকড়াও করো না অসতর্ক অবস্থায়, আর আমাদেরকে অমনোযোগীদের অন্তর্ভূক্ত করবেন না।
ওমর রা. দুআ করতেন : হে মাবুদ, আমরা সময়ের বরকত ও কল্যাণময় অংশটুকু লাভের আবেদন করছি। আলী রা. বলতেন : চলমান দিনগুলো তোমাদের জন্য পুস্তিকা বা আমলনামা স্বরূপ। তাই উত্তম আমল দ্বারা উহাকে স্থায়ী করে রাখো। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলতেন, আমি ঐ দিনটির চেয়ে অন্য কোন বস্তুর উপর অধিক অনুতপ্ত হই না, যে দিনটি আমার জীবন থেকে হ্রাস পেল অথচ তাতে কোন নেক আমল যোগ হলো না।
সময়ই জীবন :
আরবীতে একটি প্রবাদ আছে -
الوقت هو الحياة فلا تقتلوه
সময় সে তো জীবন, সুতরাং তাকে হত্যা করো না। মানুষের চিন্তা করা উচিৎ যে, এই দুনিয়ার জীবন কি? এ তো জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে অনিশ্চিত সামান্য বিরতি। স্বর্ণ-রৌপ্য একবার হাতছাড়া হলে আবার তা ফিরে পাওয়া সম্ভব। এমনকি পূর্বের তুলনায় অধিক পাওয়াও সম্ভব। কিস্তু যে মুহূর্তটুকু একবার অতিবাহিত হয়ে যায়, তা কি কোন অবস্থায় কোন মূল্যে ফিরে আসে? অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে চিন্তা করুন সময় কি স্বর্ণ থেকে অধিক মূল্যবান নয়? নয় কি হীরকের চেয়ে অধিক দামী? ইহা কি দুনিয়ার সকল বস্তু থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়?
আগামীকাল শব্দটি মস্তবর ধোকা:
মানুষ সময় নষ্ট করে অনুতপ্ত হতো। কিন্তু এখানে তাকে একটি বিষয় অনুতপ্ত হতে দেয় না। তা হলো “আগামীকাল”। এ শব্দটি উচ্চারণ করার চেয়ে বড় অপরাধ, নির্ভীকতা, অসতর্কতা ও বোকামী আর কিছুই নেই। একটি লোকের জীবন অকার্যকর ও নষ্ট হওয়ার জন্য এই একটি শব্দই যথেষ্ট। সময় একবার মরে গেলে পরবর্তীতে তার কবরের উপর অশ্রুবর্ষণ ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। দুনিয়ার সকল মানুষ মিলে আর্তনাদ করলেও সে সময় আর ফিরে আসবে না। তাই মানুষকে “আজ” শব্দের দিকে ফিরে আসতে হবে। আজই করছি বলে দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। জ্ঞানীদের রেজিষ্ট্রিতে আগামীকাল বলতে কোন শব্দ নেই।

মুসলিম মহামনীষীদের সময়ের মূল্যায়ন:
ইতিহাসের পাতাকে যারা অলংকৃত করেছেন, হয়ে আছেন যারা স্বরণীয় ও বরণীয়, তারা সকলেই সময়ের মূল্য হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছেন। প্রবন্ধের এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তাদের সকলের কথা উল্লেখ করা সম্ভব নয়। এখানে মাত্র কয়েকজন মনীষীর আলোচনা করাই যথেষ্ট মনে করছি, বুদ্ধিমানদের জন্য ইশারাই যথেষ্ট।
১. মারুফ কারখী রহ. :
একবার তার দরবারে কিছু লোকজন এসে দীর্ঘক্ষণ বিলম্ব করল। বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, সূর্য চালনাকারী ফেরেশতা কখনও ক্লান্ত হন না। অতএব, বল দেখি তোমরা কখন উঠবে?
২. দাউদ তায়ী রহ. :
তিনি রুটির পরিবর্তে ছাতু খেতেন। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, রুটি চিবানো ও ছাতু খাওয়ার মধ্যে এই পরিমাণ সময়ের ব্যবধান, যাতে ৫০ টি আয়াত তেলাওয়াত করা যায়।
৩. মুহাম্মদ ইবনে ইসাঈল বুখারী রহ. :
হাদীস শাস্ত্রের ইমাম বুখারী রহ. ধরাপৃষ্ঠে আগমন করে যখন চোখ খুললেন, তখন সর্বত্র ইসলামী জ্ঞানের চর্চা চলছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জমানা এই মাত্র শেষ হল, সাহাবায়ে কেরামের সংশ্রবে লালিত মহাপুরুষগণ তখনও জীবিত ছিলেন। জ্ঞানের পিপাসা নিয়ে সফরের লাঠি হস্তে ধারণ করে রওয়ানা হলেন তৎকালীন মুহাদ্দিসগণের নিকট বিভিন্ন শহরে। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত হিসাব করে করে কাজে লাগিয়েছেন। কখনো কারো গীবত করেননি। তিনি বলেন : স্মৃতিশক্তি বর্ধনের একমাত্র মাধ্যম হলো -অটল, অবিচল ও একাগ্রতার সাথে পড়াশুনায় নমোনিবেশ করা। তিনি এক লক্ষ সহীহ হাদীস ও দুই লক্ষ গাইরে সহীহ হাদীস মুখস্ত করেছেন।
৪. নাহুবিদ খলীল রহ.
তিনি ছিলেন ইলমে আরুযের প্রবর্তক। তিনি বলতেন, আমার নিকট সর্বাপেক্ষা অসহ্যকর ঐ সময়টুকু, যে সময় আমি খাওয়া দাওয়া করি।
৫. ইমাম মুহাম্মদ রহ. :
তিনি তার ইলমী একাগ্রতার কারণে নিজের পোশাকের কোন খবর থাকত না। পরিবারের লোকজন ময়লা কাপড় ধৌত করে দেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কোন খবর থাকত না। একাগ্রতার কারণে কখনো কখনো সালামের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে দোয়া করে দিতেন। তার সাথে দুনিয়াবি কথা বলা নিষিদ্ধ ছিল। ঘরে একটি মোরগ ছিল, সেটির ডাকে পড়ালেখায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয় বলে তিনি সেটিকে ধরে জবাই করে দিলেন।
একই দিন নাহুবিদ কাসায়ী ও ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর ইন্তেকাল হলে বাদশা হারুনুর রশীদ বললেন : “আজ ভাষা ও ফিকাহ শাস্ত্র দাফন করে ফেললাম”।
শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ. দীর্ঘদিন ধরে মাত্র এক বেলা খানা খেতেন।
মাওলানা এজাজ আলী রহ. ক্লাশ শুরু হওয়ার ৫/১০ মিনিট পূর্বে কামরা থেকে বের হয়ে যেতেন। আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশমিরি রহ. মুমূর্ষ অবস্থায়ও কিতাব অধ্যায়ন করতেন। এ সকল মনীষীগণ সময় সংরক্ষণের উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
অমুসলিম মনীষীদের সময়ের মূল্যায়ন:
পৃথিবীর বুকে যারা বড় হয়েছেন, তারা সময়ের সদ্ব্যবহার করতে জানতেন। বিদ্যাসাগর, আশুতোশ, রবীন্দ্রনাথ, আব্রাহাম লিংকন প্রমূখ মনীষীগণ সময়ের প্রতি একটুও অবহেলা করতেন না বলেই জীবনে অফুরন্ত কর্ম-কীর্তির স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন।
ষ্টিফেনসন ইঞ্জিনে কয়লা দিতেন আর অংক কষতেন।
ওয়াট দোকানে বসে বেচাকেনা করতেন আর রসায়ন শাস্র ও জার্মানী ভাষা শিক্ষা করতেন। সময়ের অপব্যবহার করতেন না বলেই তিনি উভয় বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
ওয়াশিংটনের সেক্রেটারী একবার কিছু সময় দেরি করে এসে এই বলে ওজর পেশ করলেন যে, আমার ঘড়ি স্লো ছিল। ওয়াশিংটন বললেন: হয়ত তুমি ঘড়ি পরিবর্তন করবে, নতুবা আমি সেক্রেটারী পরিবর্তন করব।
ফিসাগোরিসের নিকট জিজ্ঞেস করা হলো সময় কি? উত্তরে তিনি বললেন: সময়ই এ দুনিয়ার আত্মা।
সময়ের আচলেই সুপ্ত আছে জাতীয় উন্নতির গূঢ় রহস্য:
সময় ব্যক্তি ও জাতির প্রধান পুজি, সময়ের সদ্ব্যবহার করেই একটি জাতি উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছতে পারে। অধুনা পাশ্চাত্য জ্ঞান ও বিজ্ঞানের চুঁড়ায় আরোহন করেছে বলে সারা দুনিয়ার মানুষ স্বীকৃতি দেয়। এ স্বীকৃতি তারা এমনিতেই ছিনিয়ে নিতে সক্ষম হয়নি। এর জন্য সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে -
وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى (سورة النجم)
আর মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়। (সূরা নজম : ৩৯)
অমুসলিমরা সময়ের যেভাবে মূল্যায়ন করেছে এর চেয়ে বেশি মূল্যায়ন করা উচিৎ ছিল মুসলমানদের। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলানরা তাদের বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা, গান-বাদ্য, মিউজিক ইত্যাদি গর্হিত কার্যকলাপ মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরেছে। আর সময়ের মূল্যায়নের মত যে সম্পদ তাদের কাছে রয়েছে তা কাজে লাগাচ্ছে না।
সময় আল্লাহর দেয়া আমানত। যে জাতি সময়ের মূল্য বুঝে না, মূল্যবান সময়কে হেলায় উড়িয়ে দেয় সে জাতির ধ্বংস অনিবার্য। সময়ের মূল্যয়ান মুসলমানদের ধর্মীয় দায়িত্ব। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমানদের শান, মর্যাদা ও বড়ত্ব সাড়া দুনিয়াকে ছেয়ে রেখেছিল। উন্নতির চরম শিখরে আরোহিত ছিল মুসলমান জাতি। ব্যক্তিগত জীবন থেকে আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত সর্বজন স্বীকৃত একটি মত এই ছিল, যে কাজটি অনর্থক, চাই সেটি যতই বিস্ময়কর হোক না কেন সেটি জীবনের পূর্ণতা বয়ে আনতে পারে না। বরং তা ঠেলে দেয় ধ্বংসের মুখে।
সময়ের অপচয় আত্মহত্যার নামান্তর :
সময় নষ্ট করা এক প্রকার আত্মহত্যা। তবে পার্থক্য এতটুকু যে, আত্মহত্যা মানুষকে চিরদিনের জন্য বঞ্চিত করে দেয়। আর সময়ের অপব্যবহার একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জীবিত ব্যক্তিকে মৃত বানিয়ে রাখে। যে মিনিট, ঘন্টা ও দিনটি অনর্থক নষ্ট হয়ে যায়, যদি মানুষ তার হিসাব করত, তাহলে উহার সমষ্টি হয়ে দাড়াত – মাস, বছর ও যুগ ।
যদি কাউকে বলা হয় যে, তোমার জীবনের ৫/১০ বছর হ্রাস করা হলো, তাহলে নিশ্চিত সে ব্যাবুল ও মর্মাহত হবে, কিন্তু তার জীবনের একটি বিরাট অংশ যে অকারণে নষ্ট করছে, তার প্রতি সে একটুও ভ্রুক্ষেপ করছে না।
মাত্র পাঁচ মিনিট দেরি হওয়ার কারণে নেপালিয়নের মত অজেয় সেনাপতিকেও পরাজিত হতে হয়েছে। যথা সময়ে কর্তব্য আদায় না করায় ব্যর্থতার বোঝা বহন করতে হয়েছিল।
তুমি খুশি থাক আর চিন্তিত থাক, কষ্ট ও পেরেশিন থেকে বাঁচার একমাত্র মাধ্যম হলো ব্যস্ত থাকা। সামান্য সময়ের জন্যেও অবসর না থাকা। অলসতা মানুষকে এমনিভাবে খেয়ে ফেলে যেমনিভাবে খেয়ে ফেলে মরিচিকা লৌহ দন্ডকে।
অতএব, সময়কে কাজে লাগিয়ে মানুষ হয়ত জ্ঞান বিজ্ঞানের উচু শিখরে আরোহন করবে, নতুবা অজ্ঞতা ও বর্বরতার অন্ধকার তাকে কোথা হতে কোথায় নিয়ে যাবে তা টের পাওয়াও যাবে না।

সময় সংরক্ষণের কতিপয় মূলনীতি:
সময় মানব জীবনের মূল্যবান পুঁজি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো মানুষ উহা যে পরিমাণ নির্ভীকতা, নিষ্ঠুরতা ও অবহেলা করে নষ্ট করে দেয়, তার আয়ত্বাধীন অন্য কোন জিনিষ এমনিভাবে নষ্ট করে না। এদিকে লক্ষ্য করে সময়ের সঠিক ব্যবহারের তিনটি মূলনীতি রচনা করা হল।
১. রুটিন :
দিবারাত্রির প্রতিটি কাজের জন্য একটি নিদিষ্ট সময় নির্ধারণ করার নাম রুটিন। ক্ষণিকের জীবনে মানুষকে অনেক কাজ করতে হয়। পাড়ি দিতে হয় তাকে জীবন নৌকার প্রতিটি ঘাটি। সকল কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করা তখনই সম্ভব ও সহজ হবে, যখন সে পূর্ব থেকেই একটি রুটিন তৈরি করে নেবে।
তবে রুটিন করতে গিয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে। যে কাজ যে সময় সম্পাদন করা অধিক উপযোগী সে কাজ তখনই করতে হবে। উদাহরণত : যে সকল কাজে উদ্যমতা ও সুস্থ মস্তিস্ক প্রয়োজন সে সকল কাজের সময়সূচী এমন সময় রাখতে হবে, যখন মস্তিস্ক সুস্থ, সবল ও ঠান্ডা থাকে, এবং মানব প্রকৃতিতে যৌবনতা অটুট থাকে। আর সে সময়টি হলো সকাল। প্রভাতে মানুষের স্মৃতিশক্তি ও যোগ্যতা সজীবতায় আচ্ছন্ন থাকে। এ কারণেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় উম্মতের জন্য দোয়া করেছেন -
اللهم بارك لأمتي في بكورها. (رواه الترمذي)
হে আল্লাহ তুমি আমার উম্মতের জন্য প্রভাতে বরকত দান কর। (তিরমিজি)
সময়সূচী নির্ধারিত থাকলে কোন সময় কি দায়িত্ব সে সম্পর্কে চিন্তা করে সময় নষ্ট করতে হয় না। এমনিতেই তার স্মরণে এসে যায়।
২. সুস্থতা:
সুস্থতা মানব জীবনের একটা বড় নেয়ামত। মন মস্তিস্কের সুস্থতা দেহের সুস্থতার উপর নির্ভরশীল। দেহ ও মন আমাদের কাছে খোদাপ্রদত্ত আমানত। তাই এ আমানতের হক আদায় করতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
إن لربك عليك حقا ، ولنفسك عليك حقا ، ولأهلك عليك حقا ، فأعط كل ذي حق حقه، (رواه البخاري)
যেমনি তোমার উপর তোমার প্রভূর হক রয়েছে, তেমনি তোমার দেহ ও পরিবার-পরিজনের হকও তোমার উপর রয়েছে। অতএব, প্রত্যেককে তাদের প্রাপ্য আদায় করে দাও।
খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. একবার আরাম করছিলেন। এ সময় তার এক পুত্র এসে বলল, আব্বা আপনি শুয়ে আছেন; অথচ লোকজন আপনার অপেক্ষায় (দরজায়) দাড়িয়ে আছে? তিনি বললেন: হে বৎস! দেহ আমার বাহনস্বরূপ, আমার ভয় হচ্ছে যদি মাত্রাতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেই তাহলে তা (অপারগ হয়ে) বসে পড়বে।
যথা সময়ে সুষ্ঠু সুন্দর কার্য সম্পাদন করতে হলে শারীরিক সুস্থতা সংরক্ষণের প্রতি দৃষ্টি রাখা একটি প্রকৃতিগত বিষয়। কাজ অল্প হোক, কিন্তু তা নিয়মিত হওয়া চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
وإن أحب الأعمال إلى الله ما دام وإن قل، (رواه البخاري)
আল্লাহর কাছে ঐ আমল সবচেয়ে প্রিয় যা অল্প হলেও নিয়মিত করা হয়।
৩. আত্মসমালোচনা:
কি ব্যয় হলো আর কি পাওয়া গেল? কতটুকু উপার্জিত হল, আর কতটুকু লোকসান হলো? এটা নির্ণয় করার কষ্টিপাথরের অপর নাম ইহতেসাব বা আত্মসমালোচনা। এভাবে কড়ায় গন্ডায় হিসেব লাগালে অন্তরে অনুশোচনার সৃষ্টি হয়। এবং ভবিষ্যতে সময় নষ্ট না করার মানসিকতা সৃষ্টি হয়।

উপসংহার:
ঘড়ি টিক টিক করে অবিরাম গতিতে চলছে আর বলছে তোমরা তোমাদের কর্তব্য-কর্ম সম্পন্ন কর, উপকার তেমাদেরই হবে। তাই সময়ের নিকট থেকে আমাদের পাওনা কড়ায় গন্ডায় আদায় করে নিতে হবে। এক মুহূর্ত সময়ও যেন বৃথা ক্ষয় না হয় সেদিকে বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। কবি গুরু বলেছেন :
“কাল স্রোতে ভেসে যায় জীবন-যৌবন, ধন-মান। কিন্তু যা ভেসে যায় না তা হলো কীর্তি”।
যে সকল সনামধন্য পুরুষগণের কীর্তি ও প্রতিভা দেখে আমরা মুগ্ধ ও অবিভূত, তাদের কীর্তি প্রতিষ্ঠার মূলে আছে সময়ানুবর্তিতা। সময়ানুবর্তিতাই জীবনে সাফল্য লাভের চাবিকাঠি।

ভাস্কর্য, প্রতিমা ও স্মৃতিসৌধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের বিধান

বিশিষ্ট মূর্তি। আর স্মৃতিসৌধ যার আরবী প্রতিশব্দ نصب নিশানা ও পাথর। মুশরিকগণ তাদের কোন নেতা বা সম্মানিত ব্যক্তির স্মৃতিচারণায় এসব স্মৃতিসৌধের কাছে কুরবানী করত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন প্রাণীর ছবি বানাতে নিষেধ করেছে, বিশেষ করে মানুষের মধ্যে যারা সম্মানিত, যেমন, আলেম, বাদশাহ, ইবাদাত গুজার ব্যক্তি, নেতা ও রাষ্ট্রপতি প্রমুখ ব্যক্তিবর্গের ছবি। চাই এ ছবি কোন বোর্ড বা কাগজ কিংবা দেয়াল বা কাপড়ের ভাস্কর্য ও প্রতিমা (যাকে আরবীতে এক বচনে تمثال ও বহুবচনে تماثيل বলা হয়) হচ্ছে মানুষ, জীব-জন্তু বা অন্য কোন প্রাণীর আকৃতি উপর হাতে আঁকার মাধ্যমে তৈরি করা হোক অথবা এ যুগে প্রচলিত আলোকযন্ত্র (অর্থাৎ ক্যামেরা) এর মাধ্যমে নেয়া হোক কিংবা প্রতিমার আকৃতিতে খোদাই করে তা তৈরি করা হোক । অনুরূপভাবে তিনি দেয়াল ইত্যাদিতে ছবি টাঙ্গানো, কোথাও ভাস্কর্য ও প্রতিমা স্থাপন এবং স্মৃতিসৌধ স্থাপন করা থেকে নিষেধ করেছেন। কেননা এগুলো শিরকী কাজে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যম।

পৃথিবীতে শিরকের প্রথম ঘটনা ছবি তৈরি ও মূর্তি স্থাপনের মাধ্যমেই ঘটেছিল। ঘটনাটি ছিল এমন যে, নূহ আলাইহিস সালামের কওমে কতেক নেককার লোক ছিল। তাদের মৃত্যু হলে লোকেরা খুবই দুঃখ পেল। তখন শয়তান তাদের অন্তরে এ কথার উদ্রেক করল যে, এসব নেককার লোকেরা যেখানে বসত, তোমরা সেখানে তাদের প্রতিমা স্থাপন কর এবং সেগুলোকে তাদের নামে অভিহিত কর। তাই তারা এ কাজ করে। তবে সে সময় প্রতিমাগুলোর পূজা-অর্চনা হয়নি। এরপর যখন সে প্রজন্মের লোকদের তিরোধান হল এবং তাদের পরবর্তীরা সে প্রতিমা ও সৌধের প্রকৃত ইতিহাস ভুলে গেল, তখন সেগুলোর পূজা-অর্চনা হতে লাগল। অতঃপর আল্লাহ যখন নূহ আলাইহি সালামকে প্রেরণ করলেন এবং তিনি স্বজাতিকে মূর্তি স্থাপনের মাধ্যমে অর্জিত শিরক থেকে নিষেধ করলেন, তারা তার আহবান মেনে নিতে অস্বীকার করল। আর সেই সব মূর্তির ইবাদাতে তারা ডুবে থাকল যেগুলো পরবর্তীতে দেবতায় পরিণত হল। আল্লাহ বলেন:

وَقَالُوا لَا تَذَرُنَّ آَلِهَتَكُمْ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَلَا سُوَاعًا وَلَا يَغُوثَ وَيَعُوقَ وَنَسْرًا ﴿نوح:২৩﴾

‘এবং তারা বলল, তোমরা তোমাদের উপাস্যদেরকে ত্যাগ করো না, এবং ত্যাগ করো না ওয়াদ্দ, সুয়াআ, ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসরকে’। (সূরা নূহ: ২৩)

এগুলো হল সেই সব লোকদের নাম যাদের আকৃতিতে ঐ সকল মূর্তি বানিয়ে রাখা হয়েছিলো, যাতে তাদের স্মৃতি জাগরুক রাখা যায় এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা যায়।

এখন দেখুন, স্মৃতিচারণার উদ্দেশ্যে স্থাপিত এই সব মূর্তির ফলে অবস্থা শেষ পর্যন্ত এই-ই দাঁড়িয়েছে যে, মানুষ আল্লাহর সাথে শিরক করল এবং নবী রাসূলগণের শত্রুতায় অবতীর্ণ হল। এর ফলে তারা ঝড়-তুফানে ধ্বংস হল এবং আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টিকুলের ক্রোধের শিকারে পরিণত হল। এসব কিছু ছবি তৈরি ও প্রতিমা স্থাপনের ভয়াবহতা প্রমাণ করে। এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছবি প্রস্তুত কারীদের লা’নত দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, কিয়ামতের দিন এদেরকে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। তাই তিনি ছবি মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন,

যে ঘরে ছবি আছে সে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।

মূলত: ছবি তৈরির অনেক ক্ষতিকর দিক এবং মুসলিম উম্মার আকীদা ও বিশ্বাসে এর ভয়াবহতার প্রতি লক্ষ্য করেই এসকল কথা বলা হয়েছে। কেননা প্রতিমার ছবি স্থাপনের মাধ্যমেই পৃথিবীতে প্রথম শিরকের উদ্ভব ঘটেছিল। আর এ ধরনের প্রতিকৃতি ও ভাস্কর্য চাই বসার স্থানে কিংবা কোন মাঠে অথবা পার্কে যেখানেই স্থাপন করা হোক না কেন, শরীয়তে তা পুরোপুরি হারাম। কেননা এটা হল শিরকে লিপ্ত হওয়া, আকীদা বিনষ্ট হওয়ার একটি কারণ।

আর আজকের যুগে যদি কাফিররা এ কাজ কারে থাকে -কেননা তাদের এমন বিশেষ আকীদা নেই, যে আকীদার তারা হেফাজত করে থাকে- তাহলে মুসলমানদের জন্যে কিন্তু কাফিরদের অনুরূপ উক্ত কাজে অংশ গ্রহণ জায়েজ নয়। উদ্দেশ্য হল- মুসলমানরা যাতে তাদের স্বীয় আকীদার হেফাজত ও সংরণ করতে পারে, যা তাদের শক্তি ও শান্তির উৎস।

মুসলমানের চারিত্রিক গুনাবলী

ইসলামী শরীয়ত হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ জীবন পদ্ধতি যা সকল দিক থেকে সার্বিকভাবে মুসলমানের ব্যক্তিগত জীবনকে গঠন করার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে এসব দিকের মধ্যে গুনাবলি-শিষ্টাচার ও চরিত্রের দিকটি অন্যতম। ইসলাম এদিকে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। তাইতো আকীদা ও আখলাকের মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছে, যেমন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, “মুমিনদের মধ্যে পরিপূর্ণ ঈমানদার হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।” [আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযি ]

সুতরাং উত্তম চরিত্র হচ্ছে ঈমানের প্রমাণবাহী ও প্রতিফলন। চরিত্র ব্যতীত ঈমান প্রতিফলিত হয় না বরং নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, তাঁকে প্রেরণের অন্যতম মহান উদ্দেশ্য হচ্ছে চরিত্রের উত্তম দিকসমূহ পরিপূর্ণ করে দেয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“আমি তো কেবল চরিত্রের উত্তম দিকসমূহ পরিপূর্ণ করে দিতে প্রেরিত হয়েছি।”

ইমাম আহমাদ ও ইমাম বুখারী আদাবুল মুফরাদে বর্ণনা করেছেন।

এ কারণেই আল্লাহ তাআলা উত্তম ও সুন্দরতম চরিত্রের মাধ্যমে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَإِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيمٍ

“নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত।” সূরা আল কালাম : ৪

কোথায় এ চরিত্র বর্তমান বস্তুবাদী মতবাদ ও মানবতাবাদী মানুষের মনগড়া চিন্তা চেতনায়? যেখানে চরিত্রের দিককে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে, তা শুধু সুবিদাবাদী নীতিমালা ও বস্তুবাদী স্বার্থের উপর প্রতিষ্ঠিত। যদিও তা অন্যদের উপর জুলুম বা নির্যাতনের মাধ্যমে হয়। অন্য সব জাতির সম্পদ লুন্ঠন ও মানুষের সম্মান হানীর মাধ্যমে অর্জিত হয়।

একজন মুসলমানের উপর তার আচার-আচরণে আল্লাহর সাথে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে, অন্য মানুষের সাথে, এমনকি নিজের সাথে কি ধরনের আচরণ করা উচিত ইসলাম তার এক চকমপ্রদ চিত্র অংকন করে দিয়েছে। যখনই একজন মুসলমান বাস্তবে ও তার লেনদেনে ইসলামী চরিত্রের অনুসরণ করে তখনই সে অভিষ্ট পরিপূর্ণতার অতি নিকটে পৌঁছে যায়, যা তাকে আরো বেশি আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও উচ্চ মর্যাদার সোপানে উন্নীত হতে সহযোগিতা করে। পক্ষান্তরে, যখনই একজন মুসলমান ইসলামের চরিত্র ও শিষ্টাচার হতে দূরে সরে যায় সে বাস্তবে ইসলামের প্রকৃত প্রাণ চাঞ্চল্য, নিয়ম-নীতির ভিত্তি হতে দূরে সরে যায়। সে যান্ত্রিক মানুষের মত হয়ে যায়, যার কোন অনুভূতি এবং আত্মা নেই।

ইসলামে ইবাদতসমূহ চরিত্রের সাথে কঠোরভাবে সংযুক্ত। যে কোন ইবাদত একটি উত্তম চরিত্রের প্রতিফলন ঘটায় না তার কোন মূল্য নেই। আল্লাহর সামনে নামায আদায়ের ক্ষেত্রে দেখা যায় নামায একজন মানুষকে অশ্লীল ও অপছন্দনীয় কাজসমূহ হতে রক্ষা করে, আত্মশুদ্ধি ও আত্মার উন্নতি সাধনে এর প্রভাব রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ

“নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল, অপছন্দনীয় কাজ হতে নিষেধ করে।” [সূরা আল-আনকাবুত :৪৫ ]

অনুরূপভাবে রোযা তাক্কওয়ার দিকে নিয়ে যায়। আর তাক্বওয়া হচ্ছে মহান চরিত্রের অন্যতম, যেমন- আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেমনি ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যাতে তোমরা তাক্বওয়া লাভ করতে পার।” [সূরা আল বাকারা : ১৮৩ ]

রোযা অনুরূপভাবে শিষ্টাচার, ধীরস্থিরতা, প্রশান্তি, ক্ষমা, মুর্খদের থেকে বিমুখতা ইত্যাদির প্রতিফলন ঘটায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“তোমাদের কারো রোযার দিন যদি হয়, তাহলে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে, হৈ চৈ না করে অস্থিরতা না দেখায়। যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে লড়াই করে সে যেন বলে দেয় আমি রোযাদার।

বুখারী ও মুসলিম

যাকাতও অনুরূপভাবে অন্তরকে পবিত্র করে, আত্মাকে পরিমার্জিত করে এবং তাকে কৃপণতা, লোভ ও অহংকারের ব্যধি হতে মুক্ত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا

“তাদের সম্পদ হতে আপনি সাদকাহ গ্রহণ করুন যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিমার্জিত করবেন।”

[সূরা তাওবাহ ১০৩ আয়াত ]

আর হজ্জ হচ্ছে একটি বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণশালা, আত্মশুদ্ধি, হিংসা বিদ্ধেষ ও পঙ্কিলতা থেকে আত্মাকে পরিশুদ্ধি ও পরিমার্জনের জন্য।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَمَنْ فَرَضَ فِيهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي الْحَجِّ

“যে এ মাসগুলোতে নিজের উপর হজ্জ ফরয করে নিল সে যেন অশ্লীলতা, পাপাচার ও ঝগড়া বিবাদ হজ্জের মধ্যে না করে।” [সূরা আল বাকারাহ : ১৯৭]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“যে ব্যক্তি অশ্লীল কথা-বার্তা ও পাপ কর্ম না করে হজ্জ পালন করল, সে তার পাপরাশি হতে তার মা যেদিন জন্ম দিয়েছে সে দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে ফিরে এল।”

বুখারী ও মুসলিম।



ইসলামী চরিত্রের মৌলিক বিষয়সমূহ

১. সত্যবাদিতা

আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের যে সকল ইসলামী চরিত্রের নির্দেশ দিয়েছেন, তার অন্যতম হচ্ছে সত্যবাদিতার চরিত্র।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ

“হে ঈমানদারগণ আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমরা সত্যবাদীদের সাথী হও।” সূরা আত-তাওবাহ : ১১৯

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“তোমরা সততা অবলম্বন গ্রহণ কর, কেননা সত্যবাদিতা পুণ্যের পথ দেখায় আর পূণ্য জান্নাতের পথ দেখায়, একজন লোক সর্বদা সত্য বলতে থাকে এবং সত্যবাদিতার প্রতি অনুরাগী হয়, ফলে আল্লাহর নিকট সে সত্যবাদী হিসাবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।”

[ সহিহ মুসলিম]





২. আমানতদারিতা

মুসলমানদের যে সব ইসলামী চরিত্র অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে তার একটি হচ্ছে আমানতসমূহ তার অধিকারীদের নিকট আদায় করে দেয়া। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের নিকট আদায় করে দিতে।” সূরা আন নিসা : ৫৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট আল আমীন উপাধি লাভ করেছিলেন, তারা তাঁর নিকট তাদের সম্পদ আমানত রাখত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার অনুসারীদের মুশরিকরা কঠোরভাবে নির্যাতন শুরু করার পর যখন আল্লাহ তাকে মক্কা হতে মদীনা হিজরত করার অনুমতি দিলেন তিনি আমানতের মালসমূহ তার অধিকারীদের নিকট ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা না করে হিজরত করেননি। অথচ যারা আমানত রেখেছিল তারা সকলেই ছিল কাফের। কিন্তু ইসলাম তো আমানত তার অধিকারীদের নিকট ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছে যদিও তার অধিকারীরা কাফের হয়।



৩. অঙ্গীকার পূর্ণ করা

ইসলামী মহান চরিত্রের অন্যতম হচ্ছে অঙ্গীকার পূর্ণ করা। আল্লাহ তাআলা বলেন :

وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا

“আর অঙ্গীকার পূর্ণ কর, কেননা অঙ্গীকার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে।” সূরা ইসরা : ৩৪

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকরা মুনাফিকের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গণ্য করেছেন।



৪. বিনয়

ইসলামী চরিত্রের আরেকটি হচ্ছে একজন মুসলমান তার অপর মুসলিম ভাইদের সাথে বিনয়ী আচরণ করবে। সে ধনী হোক বা গরীব। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ

“তুমি তোমার পার্শ্বদেশ মুমিনদের জন্য অবনত করে দাও।” সূরা আল হিজর : ৮৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহী করেছেন যে, ‘তোমরা বিনয়ী হও যাতে একজন অপরজনের উপর অহংকার না করে। একজন অপর জনের উপর সীমালংঘন না করে।” -মুসলিম।

৫. মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার

মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার উত্তম চরিত্রের অন্যতম। আর এটা তাদের অধিকার মহান হওয়ার কারণে, যে অধিকারের স্থান হল আল্লাহর হকের পরেই। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

‘আর আল্লাহর ইবাদত কর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না, এবং মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর।” [সূরা আন-নিসা : ৩৫ আয়াত]

আল্লাহ তাআলা তাদের আনুগত্য, তাদের প্রতি দয়া ও বিনয় এবং তাদের জন্য দু’আ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :

وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُلْ رَبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

“তাদের উভয়ের জন্য দয়ার সাথে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বল, হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া কর যেভাবে শৈশবে আমাকে তারা লালন-পালন করেছেন।” [সূরা আল ইসরা : ২৪ ]

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশী অধিকারী ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ অত:পর জিজ্ঞেস করল তারপর কে? তিনি উত্তর দিলেন, ‘তোমার মা।’ অতঃপর জিজ্ঞেস করল তার পর কে? তিনি উত্তর দিলেন, ‘তোমার মা।’ অতঃপর জিজ্ঞেস করল তার পর কে? উত্তর দিলেন, ‘তোমার পিতা।’

বুখারী ও মুসলিম

মাতা-পিতার প্রতি এ সদ্ব্যবহার ও দয়া-অনুগ্রহ অতিরিক্ত বা পূর্ণতা দানকারী বিষয় নয় বরং তা হচ্ছে সকল মানুষের ঐক্যমতের ভিত্তিতে ফরযে আইন।



৬. আত্মীয়তার সর্ম্পক বজায় রাখা

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামী চরিত্রের অন্যতম। আর তারা হচ্ছে নিকটাত্মীয়গণ যেমন, চাচা, মামা, ফুফা, খালা, ভাই, বোন প্রমূখ।

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ওয়াজিব, আর তা ছিন্ন করা জান্নাত হতে বঞ্চিত ও অভিশাপের কারণ। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ ﴿২২﴾ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ ﴿২৩﴾

“ যদি তোমরা ক্ষমতা পাও, তাহলে কি তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? তারা তো ঐ সব লোক যাদের প্রতি আল্লাহ অভিশাপ করেছেন। এতে তিনি তাদেরকে বধির করে দিয়েছেন এবং তাদের দৃষ্টি অন্ধ করে দিয়েছেন।” [সূরা মুহাম্মাদ : ২২-২৩]

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী বেহেশ্তে প্রবেশ করবে না।” [বুখারী ও মুসলিম]



৭. প্রতিবেশীর প্রতি সুন্দরতম ব্যবহার

প্রতিবেশীর প্রতি সুন্দরতম ব্যবহার হচ্ছে ইসলামী চরিত্রের অন্যতম। প্রতিবেশী হচ্ছে সে সব লোক যারা আপনার বাড়ীর আশে পাশে বসবাস করে। যে আপনার সবচেয়ে নিকটবর্তী সে সুন্দর ব্যবহার ও অনুগ্রহের সবচেয়ে বেশী হকদার। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ

“আর মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার কর, নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকীন নিকটতম প্রতিবেশী ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর প্রতিও।” সূরা আন-নিসা : ৩৬

এতে আল্লাহ নিকটতম ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর প্রতি সদ্ব্যবহার করতে ওসিয়ত করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেনঃ

‘জিবরীল আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে ওসিয়ত করতেছিল এমনকি আমি ধারণা করেনিলাম যে, প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকার বানিয়ে দেয়া হবে।’ বুখারী ও মুসলিম

অর্থাৎ আমি মনে করেছিলাম যে ওয়ারিশদের সাথে প্রতিবেশীর জন্য মিরাসের একটি অংশ নির্ধারিত করে দেবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু যর রা. কে লক্ষ্য করে বলেন, ‘হে আবু যর! যখন তুমি তরকারী রান্না করবে কর তখন পানি বেশি করে দিবে, আর তোমার প্রতিবেশীদের অঙ্গীকার পূরণ কর।” [ সহিহ মুসলিম]

প্রতিবেশীর পার্শ্বাবস্থানের হক রয়েছে যদিও সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি অবিশ্বাসী বা কাফের হয়।



৮. মেহমানের আতিথেয়তা

ইসলামী চরিত্রের আরেকটি হচ্ছে মেহমানের আতিথেয়তা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী,

“যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।” বুখারী ও মুসলিম।



৯. সাধারণভাবে দান ও বদান্যতা

ইসলামী চরিত্রের অন্যতম দিক হচ্ছে দান ও বদান্যতা। আল্লাহ তাআলা ইনসাফ, বদান্যতা ও দান কারীদের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُونَ مَا أَنْفَقُوا مَنًّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ

“যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে অতঃপর যা খরচ করেছে তা থেকে কারো প্রতি অনুগ্রহ ও কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্য করে না, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট প্রতিদান রয়েছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুশ্চিন্তাও করবে না।” সূরা আল বাকারাহ : ২৬২

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

‘যার নিকট অতিরিক্ত বাহন থাকে সে যেন যার বাহন নেই তাকে তা ব্যবহার করতে দেয়। যার নিকট অতিরিক্ত পাথেয় বা রসদ রয়েছে সে যেন যার রসদ নেই তাকে তা দিয়ে সাহায্য করে।” মুসলিম



১০. ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা

ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা হচ্ছে ইসলামী চরিত্রের অন্যতম বিষয়। অনুরূপভাবে মানুষদের ক্ষমা করা, দুর্ব্যবহারকারীকে ছেড়ে দেয়া, ওজর পেশকারীর ওজর গ্রহণ করা বা মেনে নেয়াও অন্যতম। আল্লাহ তাআলা বলেন ঃ

وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ

“আর যে ধৈর্য্য ধারণ করল এবং ক্ষমা করল, নিশ্চয়ই এটা কাজের দৃঢ়তার অন্তর্ভুক্ত।” সূরা আশ শুরা : ৪৩

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

‘তারা যেন ক্ষমা করে দেয় এবং উদারতা দেখায়, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেয়া কি তোমরা পছন্দ কর না?’

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

“দান খয়রাতে সম্পদ কমে যায় না। আল্লাহ তাআলা ক্ষমার দ্বারা বান্দার মার্যাদা বৃদ্ধিই করে দেন। যে আল্লাহর জন্য বিনয় প্রকাশ করে আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধিই করে দেন।” [মুসলিম ]

তিনি আরো বলেন,

“দয়া কর, তোমাদের প্রতি দয়া করা হবে। ক্ষমা করে দাও তোমাদেরও ক্ষমা করে দেয়া হবে।” আহমাদ



১১. মানুষের মাঝে সমঝোতা ও সংশোধন:

ইসলামী চরিত্রের আরেকটি হচ্ছে মানুষের মাঝে সমঝোতা ও সংশোধন করে দেয়া, এটা একটি মহান চরিত্র যা ভালবাসা সৌহার্দ প্রসার ও মানুষের পারষ্পারিক সহযোগিতার দিকে নিয়ে যায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন :

لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاةِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا

“তাদের অধিকাংশ শলাপরামর্শের মধ্যে কল্যাণ নেই। কেবল মাত্র সে ব্যক্তি ব্যতীত যে সাদকাহ, সৎকর্ম ও মানুষের মাঝে সংশোধনের ব্যাপারে নির্দেশ দেয়। যে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে এসব করে অচিরেই আমরা তাকে মহা প্রতিদান প্রদান করব।” সূরা আন নিসা : ১১৪



১২. লজ্জা:

ইসলামী চরিত্রের অন্যতম আরেকটি চরিত্র হচ্ছে লজ্জা। এটা এমন একটি চরিত্র যা পরিপূর্ণতা ও মর্যাদাপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিকে আহবান করে। অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা হতে বারণ করে। লজ্জা আল্লাহর পক্ষ হতে হয়ে থাকে। ফলে মুসলমান লজ্জা করে যে, আল্লাহ তাকে পাপাচারে লিপ্ত দেখবে। অনুরূপভাবে মানুষের থেকে এবং নিজের থেকেও সে লজ্জা করে। লজ্জা অন্তরে ঈমান থাকার প্রমাণ বহন করে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

‘লজ্জা ঈমানের বিশেষ অংশ।’ বুখারী ও মুসলিম।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,

“লজ্জা কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসে না।” বুখারী ও মুসলিম



১৩. দয়া ও করুণা:

ইসলামী চরিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র হচ্ছে দয়া বা করুণা। এ চরিত্রটি অনেক মানুষের অন্তর হতে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। ফলে তাদের অন্তর পাথরের মত অথবা এর চেয়েও শক্ত হয়ে গেছে। আর প্রকৃত মু’মিন হচ্ছে দয়াময়, পরোপকারী, গভীর অনুভূতি সম্পন্ন উজ্জল অনুগ্রহের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

ثُمَّ كَانَ مِنَ الَّذِينَ آَمَنُوا وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ وَتَوَاصَوْا بِالْمَرْحَمَةِ ﴿১৭﴾ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ ﴿১৮﴾

“অত:পর সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয় যারা ঈমান এনেছে পরস্পর পরস্পরকে ধৈর্য্য ও করুণার উপদেশ দিয়েছে। তারা হচ্ছে দক্ষিণ পন্থার অনুসারী।” সূরা আল-বালাদ : ১৭- ১৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“মুমিনদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য, করুণা, অনুকম্পার উপমা হচ্ছে একটি শরীরের মত। যখন তার একটি অঙ্গ অসুস্থ হয় গোটা শরীর নিদ্রাহীনতা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।” মুসলিম



১৪. ইনসাফ বা ন্যায়পরায়ণতা:

ন্যায় পরায়ণতা ইসলামী চরিত্রের আরেকটি অংশ। এ চরিত্র আত্মার প্রশান্তি সৃষ্টি করে। সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন প্রকার অপরাধ বিমোচনের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা ইহসান ও নিকটাত্মীয়দের দান করতে নির্দেশ দেন।” সূরা আল নাহাল : ৯০

আল্লাহ তাআলা বলেন :

اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى

“ইনসাফ কর, এটা তাক্বওয়ার অতীব নিকটবর্তী।” সূরা আল মায়িদা : ৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন,

“ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিরা আল্লাহর নিকট নূরের মিম্বরের উপর বসবে। তারা হল সে সব লোক, যারা বিচার ফয়সালার ক্ষেত্রে, পরিবার-পরিজনের ক্ষেত্রে এবং যে দায়িত্বই পেয়েছে তাতে ইনসাফ করে।”



১৫. চারিত্রিক পবিত্রতা:

ইসলামী চরিত্রের অন্যতম বিষয় হচ্ছে চারিত্রিক পবিত্রতা। এ চরিত্র মানুষের সম্মান সংরক্ষণ এবং বংশে সংমিশ্রন না হওয়ার দিকে পৌঁছে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন :

وَلْيَسْتَعْفِفِ الَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّى يُغْنِيَهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ

“যাদের বিবাহের সামর্থ নেই, তারা যেন চারিত্রিক পবিত্রতা গ্রহণ করে। যতক্ষণ না আল্লাহ তার অনুগ্রহে তাকে সম্পদশালী করেন।” [সূরা আন নূর-৩৩ ]

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন,

“তোমরা আমার জন্য ছয়টি বিষয়ের জিম্মাদার হও। তাহলে আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব। যখন তোমাদের কেউ কথা বলে সে যেন মিথ্যা না বলে। যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তখন যেন খেয়ানত না করে। যখন প্রতিশ্রুতি দেয় তা যেন ভঙ্গ না করে। তোমরা তোমাদের দৃষ্টি অবনত কর। তোমাদের হস্তদ্বয় সংযত কর। তোমাদের লজ্জাস্থান হেজাফত কর।” [হাদীসটি তাবারানী বর্ণনা করেছেন এবং ‘হাসান’ বলেছেন ]

ইসলামের এসব চরিত্রে এমন কিছু নেই যা ঘৃণা করা যায়। বরং এসব এমন সম্মান যোগ্য মহৎ চারিত্রাবলী যা প্রত্যেক নিষ্কলুষ স্বভাবের অধিকারীর সমর্থন লাভ করে। মুসলমানগণ যদি এ মহৎ চরিত্র ধারণ করত তাহলে সর্বস্থান থেকে তাদের নিকট মানুষ আগমন করত এবং দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে তারা প্রবেশ করত যেভাবে প্রথম যুগের মুসলমানদের লেন-দেন ও চরিত্রের কারণে সে সময়ের মানুষ ইসলামে প্রবেশ করেছিল।

বিদআতের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও আহকাম

প্রথমত: বিদআতের সংজ্ঞা:

আভিধানিকভাবে বিদআত শব্দটি البدع শব্দ হতে গৃহীত, যার অর্থ হলো পূর্ববর্তী কোন উদাহরণ ছাড়াই কোন কিছু সৃষ্টি বা আবিষ্কার করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ﴿১১৭﴾ سورة البقرة

‘তিনিই আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিকারী’

অর্থাৎ পূর্ববর্তী কোন নমুনা ছাড়াই এত-দুভয়ের তিনি সৃষ্টিকর্তা। আল্লাহ অন্যত্র আরো বলেন:

ُ قُلْ مَا كُنْتُ بِدْعًا مِنَ الرُّسُلِ ﴿৯﴾ سورة الأحقاف

‘বলুন, আমি কোন নতুন রাসূল নই’

অর্থাৎ আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তার বান্দাদের প্রতি বার্তা-বাহক প্রথম রাসূল নই, বরং আমার পূর্বে আরো বহু রাসূল আগমন করেছেন। বলা হয়ে থাকে, ‘অমুক ব্যক্তি একটি বেদআত উদ্ভাবন করেছে’ অর্থাৎ এমন এক পন্থা প্রচলন করেছে যা তার পূর্বে আর কেউ করেনি।

উদ্ভাবন দু’ প্রকার:

১. প্রথাগত উদ্ভাবন: যেমন আধুনিক আবিষ্কৃত বস্তুসমূহের উদ্ভাবন। এটি মুবাহ এবং জায়েয। কেননা প্রথার ক্ষেত্রে ইবাহাত তথা বৈধ হওয়াই মূলনীতি (যতক্ষণ পর্যন্ত ‘না- জায়েয’ হওয়ার দলীল পাওয়া না যায়।)

২. ধর্মীয় ক্ষেত্রে উদ্ভাবন: তা হল দ্বীনের মধ্যে কোন বিদআত সৃষ্টি। এটি হারাম। কেননা দ্বীনের ক্ষেত্রে অনুসৃত নীতি হল, তাওকীফী অর্থাৎ পুরোপুরি কুরআন-সুন্নাহের উপর নির্ভরশীল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد.

‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু উদ্ভাবন করবে, যা দ্বীনের অন্তর্গত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত’

من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد.

‘কোন ব্যক্তি যদি এমন কাজ করে যা আমাদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত’

দ্বিতীয়ত: বিদআতের প্রকারভেদ:

দ্বীনের ক্ষেত্রে বিদআত দু’ শ্রেণিতে বিভক্ত:

প্রথম শ্রেণি: কথা ও আক্বীদার ক্ষেত্রে বিদআত। যেমন জাহমিয়া, মুতাযিলা, রাফেযা ও যাবতীয় ভ্রান্ত ফিরকাসমূহের বক্তব্য ও আক্বিদা।

দ্বিতীয় শ্রেণি: ইবাদতের ক্ষেত্রে বিদআত। যেমন এমন পন্থায় আল্লাহর ইবাদাত করা যা তিনি অনুমোদন করেননি।

এটিও কয়েক প্রকার:

প্রথম প্রকার: মৌলিক ইবাদাতের ক্ষেত্রে যে বিদআত হয়ে থাকে। যেমন এমন এক ইবাদাত সৃষ্টি করা, শরিয়াতে যার কোন দলীল নেই। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, এমন এক নামাজ উদ্ভাবন করা যা শরিয়াতে অনুমোদিত নয় কিংবা এমন রোজার প্রচলন যা আসলেই শরিয়তে অননুমোদিত, অথবা শরিয়ত সমর্থিত নয় এমন সব উৎসব যেমন জন্মোৎসব প্রভৃতি পালন করা।

দ্বিতীয় প্রকার: শরিয়তে অনুমোদিত ইবাদাতের ক্ষেত্রে কোন কিছু সংযোজন ও বৃদ্ধি করা। যেমন যোহর কিংবা আসর নামাজে এক রাকাত বাড়িয়ে পাঁচ রাকাত আদায় করা।

তৃতীয় প্রকার: শরিয়ত সিদ্ধ ইবাদাত আদায়ের পদ্ধতিতে যে বিদআত হয়ে থাকে। যেমন শরিয়ত সিদ্ধ নয় এমন পন্থায় তা আদায় করা। এর উদাহরণ হল: শরিয়ত অনুমোদিত যিকর এ দোয়া ইজতেমায়ী ভাবে একই তালে ও সুরে পাঠ করা। অনুরূপভাবে ইবাদাতের ক্ষেত্রে নিজের উপর এমন কঠোরতা আরোপ করা যদ্বরুণ সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত থেকে বের হয়ে যায়।

চতুর্থ প্রকার: শরিয়ত সিদ্ধ ইবাদাতের জন্য শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত নয়, এমন সময় নির্ধারণের মাধ্যমে যে বিদআত করা হয়। যেমন শা’বান মাসের ১৫ তারিখের দিন ও রাতকে রোজা ও নামাজের জন্য নির্ধারিত করা। কেননা রোজা ও নামাজ তো শরিয়ত সিদ্ধ। কিন্তু তাকে কোন এক সময়ের সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য দলীল থাকা চাই।

তৃতীয়ত: সকল শ্রেণি বিভাগসহ দ্বীনের ক্ষেত্রে বিদআতের হুকুম

দ্বীনের ক্ষেত্রে সকল বিদআতই হারাম ও ভ্রষ্টতা। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

وإياكم ومحدثات الأمور، فإن كل محدثة بدعة، وكل بدعة ضلالة.

‘নতুন নতুন বিষয় থেকে তোমরা বেঁচে থাক। কেননা প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেক বেদআত ভ্রষ্টতা’

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد.

‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু উদ্ভাবন করবে যা সে দ্বীনের অন্তর্গত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত’

من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهورد.

‘কোন ব্যক্তি যদি এমন কাজ করে যা আমাদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত’

হাদীস দু’টি দ্বারা প্রমাণিত হল যে, দ্বীনের ক্ষেত্রে নব উদ্ভাবিত সকল পন্থাই বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা ও প্রত্যাখ্যাত। এ কথার অর্থ বিদআত হারাম। তবে বিদআতের শ্রেণি বিভাগ অনুযায়ী হারাম হওয়ার ব্যাপারটি বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে। কেননা এর মধ্যে কিছু হল স্পষ্ট কুফরি। যেমন কবরবাসীদের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কবরের চারপাশে তাওয়াফ করা এবং জবেহ করা ও মান্নত করা। কবরবাসীদের কাছে দোয়া করা ও সাহায্য চাওয়া। অনুরূপভাবে এতে চরমপন্থী-জাহমিয়া ও মুতাযিলীদের বিভিন্ন বক্তব্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিদআতের মধ্যে রয়েছে যা আক্বীদাগত ফাসেকি বলে পরিগণিত।

যেমন,কথা ও আক্বীদার ক্ষেত্রে খারেজী,ক্বাদারিয়া এবং মুরজিয়াদের বিদআত যা শরিয়তের দলীল সমূহের সরাসরি পরিপন্থী।

কিছু বিদআত এমন রয়েছে যা গুনাহ বলে বিবেচিত।

যেমন, দুনিয়া ত্যাগী হওয়ার বিদআত, রোদে দাঁড়িয়ে রোজা রাখা এবং যৌন কামনা দমনের জন্য অপারেশন করার বিদআত।

ভ্রান্ত ধারনা তাবিজ-কবচ

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্ব জগতের ঘটনা প্রবাহের জন্য সঙ্গত কারণ বা মাধ্যম নির্ধারণ করেছেন। আবার কখনো কখনো এ সমস্ত কারণ ও মাধ্যমকে পরিহার করেছেন। যাতে করে মানুষ এসব কিছুকে তাদের রব বা প্রতিপালক মনে না করে। এবং তিনি এ সমস্ত কারণ ও ঘটনা প্রবাহকে এমন এক অমোঘ নিয়মে বেঁধে দিয়েছেন যার ফলে কোন কিছুই বৃথা যাবার নয় । সালাত ও সালাম ঐ রাসূলের উপর যাঁকে তিনি সমস্ত জগতের জন্য রহমত করে প্রেরণ করেছেন, যাতে করে সকলই তাঁর প্রিয় হতে পারে। অতঃপর, আল্লাহ এ বিশ্ব জগতকে অনস্তিত্ব থেকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি একে তাঁর ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে যেভাবে চান সেভাবেই পরিচালনা করেন এবং তিনিই তাঁর সৃষ্টির সকল বস্তুকে একটির উপর অপরটির অস্তিত্ব বিন্যাস করেছেন, আর এ কারণেই একটি বস্তুকে অপরটির জন্য কারণ বা মাধ্যম বানিয়েছেন ।

পূর্বেকার মুশরিকরা আল্লাহকে এই পৃথিবীতে পরিপূর্ণ ক্ষমতাবান, পরিচালনা, পরিকল্পনা এবং সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করত।

তারা এমন বিশ্বাস পোষণ করত না যে, তাদের বাতিল উপাস্য বা দেবতাগুলো বিশ্ব জগতের কোন কিছু নিয়ন্ত্রণ করে, অথবা সেগুলো কোন প্রকার কল্যাণ বা অকল্যাণ সাধনের ক্ষমতা রাখে। বরং তাদের দৃঢ় প্রত্যয় ছিল যে, এসব কিছু একমাত্র আল্লাহই পরিচালনা করে থাকেন, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন :

ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْأَرُونَ

“অতঃপর যখন তোমাদেরকে অকল্যাণ স্পর্শ করে তখন তোমরা তাঁর (আল্লাহর) নিকট বিনয় সহকারে প্রার্থনা কর। ”(সূরা আন-নাহাল ৫৩)

আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেন :

وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ

“তুমি যদি তাদের(মুশরিকদের) কে জিজ্ঞাসা কর, কে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন? তারা নিশ্চয়ই বলবে ‘আল্লাহ।”

এবং এ জন্যই আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ করেছেন যে, তিনি যেন মুশরিকদেরকে আল্লাহর বাণীর উত্তর দিতে বাধ্য করেন।

قُلْ أَفَرَأَيْتُم مَّا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ

“বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি যদি আল্লাহ আমার অনিষ্ট করার ইচ্ছা করেন তবে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ডাক তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারে? অথবা তিনি আমার প্রতি রহমত করার ইচ্ছা করলে তারা কি সে রহমত রোধ করতে পারে? বলুন, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, ভরসাকারীরা তাঁর উপরই ভরসা করে ” (সূরা যুমার ৩৮)

এবং প্রকৃত অর্থে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন তখন তারা চুপকরে রইল। কেননা মূলতঃ তারা তাদের উপাস্যদের সম্পর্কে এ ধরনের বিশ্বাস পোষণ করত না। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজকাল অনেক মুসলমানকে শয়তান পদস্খলিত করেছে -আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত দান করুন – যার ফলে তারা তাদের ভবিষ্যত বিষয়াদি এবং কার্যক্রমকে নির্ভরশীল করেছে হয়ত এক টুকরা কাপড়ের পট্টি বা সুতা অথবা একটি জুতার টুকরার উপর। এবং তারা মনে করে যে, এ গুলোর মধ্যে মানুষের জন্য কল্যাণ বা অকল্যাণ রয়েছে।

আফসোস! কোথায় উপরোল্লেখিত আয়াতের বাস্তবতা তাদের জীবনে! কোথায় তাদের বিশ্বাস যে, আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্ট? কাপড়ের পট্টি, সূতা বা জুতা নয়। এ সমস্ত হীন ও তুচ্ছ বস্তুর উপর ভরসা না করে কোথায় আল্লাহর উপর ভরসার আকীদাহ? তুমি কি জান না যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট এবং তিনি তাকে সমস্ত অকল্যণ থেকে রক্ষা করবেন।

وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ

“”যে আল্লাহর উপর ভরসা করবে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট” ( সূরা আত্- তালাক: ৩ ) আল্লাহ তোমার জন্য যথেষ্ট হওয়ার পরেও তোমার জন্য অন্য কিছুর প্রয়োজন আছে? এটাকি সম্ভব যে সুতা, জুতা, কাপড় বা চামড়ার টুকরা ব্যবহার কারীর জন্য এগুলো যথেষ্ট হতে পারে বা বিপদ থেকে তাকে বাধা দিতে পারে? সুবহানাল্লাহ! (আল্লাহ পূত পবিত্র)

آللَّهُ خَيْرٌ أَمَّا يُشْرِكُونَ

অর্থাৎ “ শ্রেষ্ঠ কে ! আল্লাহ না ওরা, যাদেরকে তারা শরীক সাব্যস্ত করে? ” (সূরা আন্ নামল ৫৯)

শুধু তাই নয় এ তুচ্ছ জিনিসগুলো কি তাদের নিজদের উপর থেকে কোন কিছুকে ঠেকাতে পারে? তুমি নিজেই যদি এগুলোকে ছিঁড়ে ফেল বা আগুনে পুড়ে ফেলার ইচ্ছা কর, তাহলে কি তোমাকে তারা বাধা দিতে পারে? তাহলে বল দেখি হে মানুষ! তোমার উপর থেকে কিভাবে তারা বিপদ ঠেকাতে পারে??

وَلاَ تَدْعُ مِن دُونِ اللّهِ مَا لاَ يَنفَعُكَ وَلاَ يَضُرُّكَ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ – وَإِن يَمْسَسْكَ اللّهُ بِضُرٍّ فَلاَ كَاشِفَ لَهُ إِلاَّ هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلاَ رَآدَّ لِفَضْلِهِ يُصَيبُ بِهِ مَن يَشَاء مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

(হে রাসূল!) আর তুমি আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে ডাকবে না যে তোমার ভালও করতে পারবে না এবং মন্দও করতে পারবে না । বস্তুতঃ তুমি যদি এমন কাজ কর, তাহলে তুমিও জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আর আল্লাহ যদি তোমার উপর কোন বিপদ আরোপ করেন তাহলে তিনি ছাড়া কেউ নেই তা থেকে মুক্ত করার, পক্ষান্তরে যদি তিনি তোমার কল্যাণ চান তবে তার কল্যাণ ঠেকাবার মতও কেউ নেই। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি অনুগ্রহ করতে চান, তাকে অনুগ্রহ করেন। বস্তুতঃ তিনি ক্ষমাশীল দয়ালু” (সূরা ইউনুস ১০৬ – ১০৭)

হে মানুষ! তোমাকে আল্লাহ বিবেক দান করে সম্মানিত করেছেন, আরো সম্মানিত করেছেন তোমাকে রিসালাতসমূহের মাধ্যমে। তুমি কি কয়েক মুহূর্তের জন্য একটু চিন্তা করতে পার? সুতা, জুতা, আর পট্টি এ সমস্ত জিনিসের মধ্যে এবং অন্যান্য জিনিসের মধ্যে কিসের পার্থক্য? হয়ত তুমি বলতে পার, নিশ্চয়ই আমিতো শুধুমাত্র এগুলোতে গিঁট দেই এবং ঝাড় ফুঁক দেই। তা হলে আমি তোমাকে বলব, কেন তুমি শরীয়ত সম্মত কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত ঝাড় ফুঁকে সীমাবদ্ধ থাক না এবং এটাই তো তোমার জন্য যথেষ্ট। বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম যার উপর ছিলেন তাই তুমি মেনে চল। এর মধ্যেই সমস্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আমার ভয় হয় যে, হয়ত তুমি বলবে যে, আমি যাদুকরের নিকট গিয়েছি সে এগুলোর উপর ঝাড় ফুঁক করেছে। কাবার রবের শপথ! এ কথাতো আরো জঘন্যতম। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি গণক বা জ্যোতিষের নিকট আসে তার চল্লিশ দিনের নামায গৃহীত হয় না । আর যে তাদের কথাকে বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর যা নাযিল হয়েছে তার সাথে কুফরি করল। আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি এসব বিষয় থেকে।

তোমার চারপাশে আল্লাহর যত সৃষ্টি জগত রয়েছে সে সবের সাথে তোমার আদান-প্রদান কিভাবে হবে তা স্পষ্ট ভাবে আল্লাহর দ্বীন ইসলামে বর্ণিত হয়েছে । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নুতন কোন কাজ শুরু করতেন তখন তিনি এর উপর আল্লাহর প্রশংসা করতেন এবং সে কাজের মধ্যে যে কল্যাণ রয়েছে বা যে কল্যাণের জন্য সেটিকে তৈরী করা হয়েছে তা আল্লাহর নিকট কামনা করতেন এবং ঐ কাজের মধ্যে যে অকল্যাণ রয়েছে বা যে অকল্যাণের জন্য তাকে তৈরি করা হয়েছে তা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। আল্লাহর হুকুমে এভাবে চাওয়ার পর ঐকাজ থেকে কল্যাণ ব্যতীত অন্য কিছু তোমার কাছে আসবে না । হে বন্ধু ! কোথায় তোমার সকাল সন্ধ্যার যিকির বা দুআগুলো? সেগুলোই তো আল্লাহর ইচ্ছায় আসল রক্ষা কবচ এবং হেফাজতের দূর্গ। তোমার হেফাজতের জন্য আল্লাহ ফেরেশতাদের মত যে সমস্ত সৈনিক তৈরী করে রেখেছেন তাদের থেকে তোমার অবস্থান কোথায়?

لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِّن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللّهِ

“তার পক্ষ থেকে প্রহরী রয়েছে তার অগ্রে এবং পশ্চাতে আল্লাহর নির্দেশে তারা তাকে হেফাজত করে”। (সূরা আর রা’দ:১১)

তুমি যত বেশী ইসলামের নিদর্শনসমূহের সংরক্ষণ করবে, তত বেশী তুমি নিরাপদ থাকবে। তুমি যখন ফজরের নামায জামাত সহকারে আদায় কর, তখন থেকে তুমি সন্ধ্যা পর্যন্ত আল্লাহর দায়িত্বে ও তাঁর হেফাজতে থাকবে। এরপরও কি তুমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো মুখাপেক্ষী? তুমি যখন তোমার ঘর থেকে বের হবে তখন বলবে:

بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ، وَ لاَ حَوْلَ وَ لاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ، اللهُمَّ إِنِّـيْ أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ أَوْ أُضَلَّ، أَوْ أَزِلَّ أَوْ أُزَلَّ، أَوْ أَظْلِمَ أَوْ أُظُلَمَ، أَوْ أَجْهل أَوْ يُـجَـهَلَ عَلَيَّ

অর্থাৎ, “আল্লাহর নাম নিয়ে তাঁরই উপর ভরসা করে বের হলাম। আল্লাহর অনুগ্রহ ব্যতীত প্রকৃত পক্ষে কোন শক্তি সামর্থ নেই। হে আল্লাহ ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি অন্যকে পথভ্রষ্ট করতে অথবা কারো দ্বারা আমি পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে, আমি অন্যকে পদস্খলন করা অথবা অন্যের দ্বারা পদস্খলিত হওয়া থেকে, আমি অন্যকে নির্যাতন করা অথবা অন্যের দ্বারা নির্যাতিত হওয়া থেকে এবং আমি অন্যকে মূর্খ অজ্ঞতায় ফেলা অথবা অন্যের দ্বারা অজ্ঞতায় পতিত হওয়া থেকে।” এই দুআ পড়ার পর তোমাকে বলা হবে: ‘তোমার জন্য যথেষ্ট হয়েছে, তুমি সঠিক পথ প্রদর্শিত হয়েছ এবং তুমি বেঁচে গেলে।’ শয়তান তোমার থেকে কেটে পড়বে এবং দূর হয়ে যাবে তার সঙ্গীদেরকে এ কথা বলতে বলতে, ‘তোমাদের আর কি করার আছে ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে যার জন্য যথেষ্ট হয়েছে, যে সঠিক পথে প্রদর্শিত হয়েছে, যে বেঁচে গেছে।’ এরপর তুমি আর কি চাও?! তুমি কি এসব মূল্যবান দুআ ছেড়ে তুচ্ছ জুতা, কাটা কাপড়ের পট্টি ইত্যাদি জিনিসের দিকে ফিরে যাবে? তুমি দৃঢ় থাক যে, এগুলো তোমার জন্য অপমান ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করবে না। গভীর মনোযোগ সহকারে রাসূলের এই হাদীস শ্রবণ কর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা এক ব্যক্তির হাতে পিতলের একখানা বালা দেখতে পেয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার হাতে এটাকি? উত্তরে লোকটি বলল, ‘এটা রোগের জন্য।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “দ্রুত এটি খুলে ফেল, কেননা এটি তোমাকে দুর্বল করা ছাড়া আর কিছুই বাড়ায় না। আর তুমি যদি এর উপরই মৃত্যু বরণ কর তাহলে কখনই সফলতা লাভ করবে না।’ ইমাম আহমদ ইমরান বিন হুসাইন থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেন।

মূলতঃ লোকটি রোগের কারণে মৃত্যুর ভয়ে কল্পনা প্রসূত এই কবচ হাতে ধারণ করেছিল। তুমি কি জান না যে এই কল্পনাপ্রসূত তাবিজ কবচ যে পর্যস্ত তুমি পরিহার না করবে সে পর্যন্ত তুমি গাণিতিক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে, এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বদ-দুআর মধ্যে পতিত হওয়াই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে । তিনি বলেন:

من تعلق تميمة فلا أ تم الله له ومن تعلق ودعة فلا ودع الله له

“যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলাবে, আল্লাহ তার কাজের পূর্ণতা দান না করুন, আর যে ব্যক্তি কড়ি ঝুলাবে আল্লাহ তাকে স্বস্তি বা শান্তি দান না করুন।” ইমাম আহমাদ উকবাহ বিন আমের থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন।

এখানে বুঝা গেল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই বদ-দুআ সব সময় তাদের উপর পতিত হতেই থাকবে। অতএব যে ব্যক্তি তাবিজ গ্রহণ করবে আল্লাহ তার কাজের পূর্ণতা দান করবেন না। তাহলে কি লাভ এ সমস্ত অহেতুক তাবিজ কবচ ব্যবহার করে? আর যে ব্যক্তি কড়ি ঝুলাবে আল্লাহ তাকে স্বস্তি বা শান্তি দান করবেন না। এ কথার মধ্যে ঐ ব্যক্তির জন্য বদ-দুআ রয়েছে। সার্বক্ষণিক সে চিন্তা ভাবনা, ভীতি ও অশান্তির মধ্যে থাকবে। স্বস্তি ও শান্তি তার থেকে হারিয়ে যাবে। যেখানে সে নিরাপত্তা চেয়েছে সেখানে ভয় ভীতিই চলতে থাকবে, যে পর্যন্ত এই অশুভ তাবীজ কবচের সাথে সম্পর্ক থাকবে ।

যে ব্যক্তি এ সকল তাবিজ-কবচের সাথে সম্পর্ক রাখে সে নিজের উপর আল্লাহর হেফাজত ও সংরক্ষণের দ্বার বন্ধ করে দেয়। হায় আফসোস! এটা তার জন্য কতবড় ধ্বংস যে আল্লাহর হেফাজত ও নিরাপত্তাকে বাদ দিয়ে পট্টি, সুতা, জুতা ইত্যাদির দিকে ফিরে যায় এবং উত্তমকে অধম দ্বারা পরিবর্তন করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

من علق شيئاً فقد وكل إليه

“যে ব্যক্তি তাবিজ কবচ জাতীয় কিছু পরল তাকে এর দায়িত্বেই ছেড়ে দেয়া হবে।” (আহমদ ও তীরমিযি থেকে বর্ণিত হাদীস) এ ছাড়াও শিরকের মধ্যে সে পতিত হবে। আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি।

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে :

( من تعلق تميمة فقد أشرك )

“যে ব্যক্তি তাবিজ বাঁধল সে শিরক করল।” হুযাইফা (রাঃ) এক ব্যক্তিকে দেখলেন নিরাপত্তার জন্য হাতে সুতা বেঁধেছে তখন তিনি তা ছিড়ে ফেললেন এবং আল্লাহর এই বাণী পড়লেন:

وَ مَا يُـؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللهِ إِلاَّ وَ هُمْ مُشْرِكُوْنَ

“অনেক মানুষ আল্লাহর উপর ঈমান রাখলেও কিন্তু তারা মুশরিক” (সূরা ইউসুফ: ১০৬)

ইবনে আবি হাতেম থেকে বর্ণিত । হুযাইফা (রাঃ) ঐ ব্যক্তিকে ধমক দিয়ে বললেন,

لو مت وهو عليك ما صليت عليك

“তুমি যদি এর উপর মৃত্যু বরণ কর তা হলে আমি তোমার জানাযার নামায পড়ব না।”

এ ধরনের শিরক হলো বড় শিরক যদি ঐ ব্যক্তি মনে করে যে, এ সকল তাবীজ-কবচ ভাল বা মন্দ করতে পারে। অথবা কোন বিপদ আসার পূর্বে তা ফিরাতে পারে। তখন এটা হবে আল্লাহর রবুবিয়্যাতে শিরক। এর দ্বারা আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করা হল। কারণ ; তার বিশ্বাস এ সকল তাবীজ-কবচ নিয়ন্ত্রণকরার ক্ষমতা রাখে। এ কারণে আল্লাহর ইবাদতেও শিরক করা হল। কেননা, এগুলোকে সে উপাস্য তুল্য মনে করেছে, আশা এবং ভয় নিয়ে এর কল্যাণের প্রতি নিজকে আকৃষ্ট করেছে। আর যদি মনে করে যে, আল্লাহ – ই একমাত্র মালিক, তিনিই নিয়ন্তা, তিনিই একমাত্র বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারেন ও তা ঠেকাতে পারেন, আর এ সকল তাবীজ-কবচ অসীলা মাত্র তা হলে এটা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু এটাও কবীরা গুনার চাইতে মারাত্মক। তা হলে বুঝা গেল যে, এটা শরীয়ত সম্মত উপায় নয়। এমন কি পরীক্ষা- নিরীক্ষার পর মানুষের জন্য যে সমস্ত ঔষধ পত্রে উপকারের প্রমাণ রয়েছে, এটা তেমনও নয়। তাহলে বুঝা গেল যে এ ধরনের কাজের অর্থ ঐ সমস্ত লোকদের বিবেক ও দ্বীন নিয়ে শয়তান খেলা করা ছাড়া আর কিছুই করছে না। এবং যে ঘণ্টা বাঁধল বা এ জাতীয় অশুভ রক্ষা কবচ গ্রহণ করল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ঐ ব্যক্তির সম্পর্ক কেটে যাওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট। যেমনটি বর্ণনা করেছেন, ইমাম আহমদ রুওয়াইফা ইবনে সাবেত (রাঃ) থেকে। তা হলে এরপর তুমি আর কি আশা করতে পার? বরং চরম দুর্দশা ও দুর্ভোগ রয়েছে ঐ সমস্ত জিনিসের মধ্যে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন, এবং তৎকালীন সময়ের যান বাহন – উট – এর গলা থেকে ঘন্টা কেটে ফেলার জন্য তিনি লোকের নিকট বার্তা নিয়ে একজন দূত পাঠিয়ে ছিলেন সে যেন তাদের মাঝে এই বলে ঘোষনা দেয়,

( لايبقين في رقبة بعير قلادة من وتر (أوقلادة ) إلاقطعت )

“ঘন্টায় নির্মিত গলাবন্ধনী উটের গলায় না রেখে অবশ্যই যেন তা কেটে ফেলা হয়।” (বর্ণনায় ইমাম বুখারী ও মুসলিম)

অতএব কারণে সকলের উপর কর্তব্য যে এ ধরনের শিরক থেকে মানুষকে বাধা দেয়া এবং যারা এর মধ্যে পড়ে আছে তাদেরকে সৎ উপদেশ দেয়া, এবং গাড়ি বা যান-বাহনে এ ধরনের তাবিজ-কবচ দেখলে তা ছিড়ে ফেলা।

আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর প্রতি যদি কারো মনের আসক্তি হয় যে, এগুলোর মাধ্যমে কল্যাণ লাভ করা যায় এবং অকল্যাণ রোধ করা যায় তাহলে বুঝতে হবে যে, সবচেয়ে বড় নোংরামি ঐ ব্যক্তিকে স্পর্শ করেছে। এ আসক্তি কখনো মনের দিক থেকে হতে পারে, কখনো কাজের মাধ্যমে হতে পারে, আবার কখনো উভয়ের মাধ্যমে হতে পারে, এ তো আরো বড় জঘন্য এবং এর সকল অবস্থাই গর্হিত। এমনকি যে সমস্ত বিষয়কে আল্লাহ মাধ্যম বানিয়েছেন কোন বান্দার উচিৎ নয় এককভাবে সে সব মাধ্যমের উপর নির্ভর করা বরং তার উচিৎ হবে কারণ বা মাধ্যম যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং একে যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁর উপর ভরসা করা। এর সাথে বিধি সম্মত ভাবে ঐ সমস্ত মাধ্যমকে অবলম্বন করা, এর উপকারী দিকগুলো কামনা করা। তবে মনে রাখা দরকার যে, কারণ বা মাধ্যম যত বড় এবং যত মযবুতই হোকনা কেন তা আল্লাহর ইচ্ছা ও নিয়ন্ত্রণের অধীন। এক চুল পরিমাণ ও এর বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। তাহলে যিনি একমাত্র মালিক, আমরা কেন তার নিকট বালা মুসিবত দূর করা, দুর্দশা উঠিয়ে নেয়া, ফয়সালাতে সহজ করা এবং তাতে দয়া করার জন্য প্রার্থনা করব না? অতএব যার মন আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে তার সকল সমস্যা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে তখন তার সকল উপায় উপকরণের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হয়ে যাবেন। তার সকল দুরূহ কাজকে তিনি সহজ করে দিবেন, সুদূর প্রসারী বিষয়কে নিকটতর করে দিবেন। আর অসহায় ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের প্রতি প্রত্যাবর্তিত হবে আল্লাহ তাকে অসম্মানিত করবেন। দুর্বল ও নিকৃষ্ট বস্তুর দিকেই তাকে সোপর্দ করবেন।

আর যে এই শিরকের ধ্বংস থেকে অন্য ব্যক্তিকে রক্ষা করতে চেষ্টা করবে তার জন্য থাকবে আল্লাহর নিকট বিরাট সওয়াব। এবং যে ব্যক্তি ন্যূন্তম এ কাজকে প্রতিহত করতে চেষ্টা করবে তার জন্যও থাকবে অফুরন্ত পুরস্কার। আমি তার জন্য আশা করব ঐ প্রতিদান যে প্রতিদানের কথা বলেছেন সাইদ বিন যোবায়ের (রাঃ)। তিনি বলেন

من قطع تميمة من إنسان كان كعدل رقبة

“যে ব্যক্তি কোন মানুষের হাত থেকে তাবিজ কেটে ফেলবে সে গোলাম আজাদ করার অনুরূপ সাওয়াব পাবে।” অর্থাৎ সে যেন একটি ক্রীতদাসকে আযাদ করে দিল।

সর্বশেষে আল্লাহর বাণী দিয়েই আমি আমার কথার ইতি টানতে চাই আল্লাহ তাআলা বলেন:

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءكُمُ الْحَقُّ مِن رَّبِّكُمْ فَمَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَمَا أَنَاْ عَلَيْكُم بِوَكِيلٍ

“বলুন, হে মানব সকল! তোমাদের নিকট সত্য এসেছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। অতএব যে এ পথে আসতে চায় সে স্বীয় মঙ্গলের জন্য- ই আসবে। আর যে পথভ্রষ্ট হতে চায় সে স্বীয় অকল্যাণের জন্যই বক্রপথ অবলম্বন করবে এবং আমি তোমাদের উপর কর্মবিধায়ক নই।’ (সূরা ইউনুস: ১০৮)

পরিশেষে সমস্ত প্রশংসা সকল জগতের প্রতিপালকের জন্য। এবং আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশ্বস্ত নবীর উপর সালাত, সালাম ও বরকত নাযিল করুন।

পরকাল ভাবনা (পর্ব :২)

পরকাল ভাবনা

গড়পড়তায় দশ বছর সময়ে সম্পূর্ণ শরীরেই পরিবর্তন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আপনার যে শরীর দশ বছর আগে ছিল তা আজ আর আপনার সাথে নেই, আপনার বর্তমান শরীর সম্পূর্ণ এক নতুন শরীর। বিগত দশ বছরে আপনার শরীরের যে অংশগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে সেগুলো যদি পুরোপুরিভাবে একত্রিত করা হয় তাহলে হুবহু আপনার আকৃতির আরেকটা মানুষ দাঁড় করানো সম্ভব হবে। এমনকি আপনার বয়স যদি একশ বছর হয়ে থাকে তাহলে আপনার মতো দশজন মানুষের কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব হবে। এ-মানুষগুলো প্রকাশ্যে আপনার মতো হবে, তবে তাতে কোনো প্রাণ থাকবে না। যার সবকিছুই থাকবে তবে আপনিই থাকবেন অনুপস্থিত। কেননা আপনি পেছনের সকল শরীর ত্যাগ করে নতুন এক শরীরকে বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এভাবে আপনার শরীর ভাঙ্গা-গড়ার এক দীর্ঘ পথ মাড়িয়ে এগোতে থাকে, পরিবর্তিত হতে থাকে প্রতিনিয়ত। শুধু আপনিই থাকেন পুরাতন, অপরিবর্তিত। যে জিনিসটাকে আপনি ‘আমি’ বলছেন তা কিন্তু থেকে যাচ্ছে আগেরটাই। আপনি যদি দশ বছর আগে কোন চুক্তি করে থাকেন তাহলে দশ বছর পরও আপনি স্বীকার করেন যে এ-চুক্তি আপনিই করেছেন। অথচ আপনার অতীতের শারীরিক অস্তিত্বের কিছুই আজ অবশিষ্ট নেই। ওই হাত এখন আর আপনার সাথে নেই যা দিয়ে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। সে জিহ্বাও নেই যা ব্যবহার করে চুক্তি সম্পর্কে আলাপ করেছিলেন। তবে আপনি এখনো ‘আপনি’ই থেকে গেছেন, এবং নির্দ্বিধায় স্বীকার করে যাচ্ছেন যে দশ বছর পূর্বে যে চুক্তি আপনি করেছেন তা আপনিই করেছেন, এবং আপনি তা পূর্ণ করতে একশতভাগ প্রস্তুত। মানুষ কোনো বিশেষ শরীরের নাম নয় যা ধ্বংস হলে মানুষও ধ্বংস হয়। মানুষ এমন একটি অভ্যন্তর অস্তিত্ব বা আত্মা, যা শরীরী অস্তিত্বের বাইরেও থাকে সজীব, প্রাণবন্ত। শরীরের পরিবর্তনশীলতা এবং আত্মার অজর অবস্থা মানুষের অবিনাশী প্রকৃতির দিকেই ইঙ্গিত করছে যা কখনো ক্ষয় অথবা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না। কিছু নির্বোধ লোকের বক্তব্য হলো, নির্দিষ্ট কিছু জড়-পদার্থের একীভূত হওয়ার নামই জীবন এবং সেগুলো বিক্ষিপ্ত হয়ে যাওয়াই মৃত্যু। এ-বক্তব্য কোনো অর্থেই বিজ্ঞানসম্মত নয়। জীবন যদি কেবল কিছু পর্দাথের বিশেষ বিন্যাসে একত্রিত হওয়ার নাম হয় তাহলে ওই সময় পর্যন্ত জীবনস্পন্দন অবশিষ্ট থাকার কথা যতক্ষণ পদার্থের এ-বিন্যাস বজায় থাকে। সাথে সাথে এটাও সম্ভব হওয়া উচিত যে, কোন দক্ষ বিজ্ঞানী পদার্থের বিশেষ কিছু অংশকে একত্রিত করে জীবন সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। আমাদের জানা মতে এদু’টোর মধ্যে একটিও সম্ভব নয়।

আমাদের অজানা নয় মৃত্যুবরণকারী কেবল সেই নয় যার শরীরের বিভিন্ন অংশ কোনো দুর্ঘটনার কারণে ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে যায়। বরং বিচিত্রভাবে ও সকল বয়সের মানুষেরই মৃত্যু হয়ে থাকে। এমনও হয় যে একজন সুস্থ সবল মানুষ হঠাৎ হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে মারা গেলো। কেন এমনটি হলো? কোন অভিজ্ঞ ডাক্তারও এর কারণ খুঁজে পায় না। মৃত ব্যক্তির শরীর তার পূর্বের বিন্যাসেই রয়ে গেছে, তাহলে হলোটা কী যার জন্য আমরা তাকে মৃত বলছি? অন্য কথায় বলতে গেলে, বিভিন্ন পদার্থের সুবিন্যস্ত কাঠামো পূর্বের ন্যায় এখনো আছে, নেই শুধু হৃদস্পন্দন। সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আগের বিন্যাসেই বিরাজমান কিন্তু তাতে যা নেই তাহলো জীবনীশক্তি। এ-বিষয়টি প্রমাণ করছে যে, কিছু জড়পদার্থের বিশেষ বিন্যাসে একত্রিত হয়ার নাম জীবন নয়, জীবন হলো তার বাইরের একটি জিনিস যার রয়েছে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব । কোনো ল্যাবরেটরিতে প্রাণবিশিষ্ট মানুষ তৈরি করা সম্ভব নয়। যদিও যান্ত্রিকভাবে শরীরের অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব। একটি প্রাণসম্পন্ন মানুষের মধ্যে সর্বশেষ বিশ্লেষণে যে রাসায়নিক পরমাণুর ভিত রয়েছে তার মধ্যে কার্বনের ধরন ঠিক তাই যা রয়েছে কয়লার মধ্যে। হাইড্রোজেন এবং অক্রিজেন একই ধরনের যা রয়েছে পানির উৎসে। বায়ুমন্ডলের অধিকাংশ যে নাইট্রোজেন দ্বারা গঠিত তা রয়েছে মানুষের মধ্যেও। তদ্রূপভাবে অন্যান্য জিনিসও। কিন্তু একটি প্রাণসম্পন্ন মানুষ কী শুধুই কিছু পরমাণুর সমন্বয় যা অজানা এক পদ্ধতিতে এক জায়গায় একসাথে জমায়েত হয়েছে? নাকি জীবন এর বাইরের অন্য কিছু? বিজ্ঞানীরা বলেন : ‘মানুষের শরীর কি কি পদার্থ দিয়ে গঠিত এ বিষয়টি যদিও আমাদের জানা, কিন্তু ঐসব পদার্থ একত্রিত করে জীবন সৃষ্টি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্য কথায় বলতে গেলে একজন সপ্রাণ মানুষের শরীর কেবল নির্জীব কিছু পরমাণুর সমষ্টির নাম নয়, বরং তা হলো প্রাণ ও পরমাণু উভয়টার সমন্বয়। মৃত্যুর পর পরমাণুর অংশটা তো আমাদের সামনেই পড়ে থাকে, কিন্তু প্রাণ তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে যায় দূরে, ধরা ছোঁয়ার বাইরে। জীবন অক্ষয় অবিনশ্বর, এ আলোচনা থেকে এ কথাটাই উঠে আসছে স্পষ্টাকারে। মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের ধারণার গুরুত্ব এ আলোচনা থেকে বুঝা যাচ্ছে। এ-বিষয়টি আমাদের চোখে আঙ্গুল রেখে বলছে যে মৃত্যুপূর্ব জীবনই কেবল জীবন নয়, বরং মৃত্যুর পরও আমাদের বেঁচে থাকতে হবে অনন্তকালের গভীরে। এ-পৃথিবী ধ্বংসশীল, তা আমাদের মেধা ও বুদ্ধি খুব সহজভাবেই মেনে নেয়। কিন্তু মানুষ এমনই এক অস্তিত্ব যার কোন ধ্বংস নেই। আমরা যখন মৃত্যুবরণ করি তখন মূলতঃ আমাদের জীবনাবসান ঘটেনা, এক ভিন্নমাত্রার জীবন-স্রোতে আবারও যাত্রা শুরু করতে অন্য কোথাও চলে যাই যেখানে নেই কোনো ক্ষয়, মৃত্যু, নাশ। মূলতঃ আমাদের এই পৃথিবীর জীবন আমাদের মূল ও অনন্তজীবনের তুলনায় অতি তুচ্ছ, নগণ্য, এমন কি হিসেবে আসার মতোই নয়।

দ্বিতীয় জগৎ

এবার আসুন ভেবে দেখা যাক দ্বিতীয়-জীবনটা কেমন হবে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন- সেখানে বেহেশত ও দোযখ রয়েছে, মৃত্যুর পর, বিচার ফয়সালা সম্পন্ন হলে মানুষমাত্রই এ-দুটির মধ্যে যেকোনো একটিতে ঢুকে যাবে। আজকের পৃথিবীতে যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুগত হবে, সৎকাজ করবে সে বেহেশতের আনন্দঘন পরিবেশে জায়গা পাবে। আর যে ব্যক্তি অসৎ, খোদাদ্রোহী হবে সে নরকরে মমন্তুদ যন্ত্রণায় নিক্ষিপ্ত হবে।

একটু ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। এ-পৃথিবীতে মানুষের প্রতিটি কৃত্যের দুটি দিক রয়েছে।

এক. অন্যসব ঘটনার মতোই এ-এক ঘটনা।

দুই. উক্ত ঘটনার পিছনে একটা ইচ্ছা কার্যকর থাকে।

প্রথম দিকটিকে ঘটনাগত এবং দ্বিতীয়টিকে চরিত্রগত দিক বলা যেতে পারে। একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি আরো উজ্জ্বল হতে পারে। ধরে নিন কোন গাছের ডালে একটি পাথর আটকা পড়ে ছিল। আর ওই গাছটির নীচ দিয়ে যাওয়ার সময় বাতাসের ঝাপটায় পাথরটি আপনার মাথায় পড়ে যায়। এমতাবস্থায় আপনি অবশ্যই গাছটির বিরুদ্ধে ক্রদ্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করে মাথায় হাত রেখে বাড়ি চলে যান । অন্যদিকে কোনো ব্যক্তি যদি একটি পাথর নিয়ে সজ্ঞানে আপনার মাথায় আঘাত করে তার বিরুদ্ধে আপনি উৎক্ষিপ্ত না হয়ে পারেন না, এমনকী উত্তেজিত হয়ে দ্বিখন্ডিত করে দিতে পারেন ওই ব্যক্তির মাথা।

বৃক্ষ ও মানুষ এ-দুয়ের আচরণের এ-পার্থক্য কেন? আপনি কেন গাছের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ হন না, মানুষের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যান প্রচন্ডভাবে। এর কারণ শুধু একটিই : বৃক্ষ অনুভূতিশূন্য আর মানুষ তার বিপরীত। বৃক্ষের কাজটি নিছক ঘটনাজাত, পক্ষান্তরে মানুষেরটা ঘটনাজাত হয়ার সাথে সাথে একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যবহ।

এর মানে, মানবকৃত্যের দুটি দিক রয়েছে। এক. এর দ্বারা একটি ঘটনা সংঘটিত হয়। দুই. কাজটি বৈধ না অবৈধ, পবিত্র মানসিকতা নিয়ে করা হচ্ছে না অপবিত্র মানসিকতা নিয়ে ইত্যাদির বিবেচনা। মানবকৃত্যের প্রথম দিকটির ফলাফল এ-পৃথিবীতেই প্রকাশ পায়, পক্ষান্তরে দ্বিতীয় দিকটির ফলাফল এ-পৃথিবীতে প্রকাশ পায় না। যদি কখনো পায় তাহলে অসম্পূর্ণরূপে। যে ব্যক্তি আপনাকে পাথর মেরেছে তার কর্মের ফলাফল তো সাথে সাথেই প্রকাশ পেয়েছে : আপনার মাথায় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তার কর্মের দ্বিতীয় দিকটির- অথাৎ ভুল জায়গায় শক্তি প্রয়োগের ফলাফল এ-পৃথিবীতে প্রকাশ পাওয়া জরুরি নয়। সে ব্যক্তির ইচ্ছা ছিলো আপনার মাথায় আঘাত করতে অতঃপর আপনি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। এর পাশাপাশি সে ইচ্ছা করেছিলো একটি অবৈধ কাজ করবে, কিন্তু তার এই ইচ্ছাটার ফলাফল এ-পৃথিবীতে আসেনি। মানুষের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশকেই ফলাফল বলে , আর আমরা দেখি যে, মানুষের ইচ্ছার ঘটনাগত ফলাফল হরহামেশাই সামনে আসছে। তাহলে মানুষের ইচ্ছার দ্বিতীয় দিকটির ফলাফলের প্রকাশ, অর্থাৎ চারিত্রিক ফলাফলও অবশ্যই প্রকাশ পাওয়া উচিত।

পরকাল মানবকৃত্যের এই দ্বিতীয় দিকটির পরিপূর্ণরূপে প্রকাশের জায়গা। মানবকৃত্যের একটি দিক যেমন কিছু ঘটনাপুঞ্জের সৃষ্টি করে, তদ্রূপভাবে মানবকৃত্যের অন্যদিকটিও নিশ্চয়ই কিছু ফলাফল সৃষ্টি করে; পার্থক্য শুধু এতটুকু যে প্রথম প্রকার ফলাফল এ-পৃথিবীতেই প্রকাশ পায়, পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকার ঘটনার ফলাফল আমরা দেখতে পাবো পরজগতে।

এ-পৃথিবীতে বসবাসরত প্রতিটি মানুষই তার কর্মের মাধ্যমে কোনো না কোনো ফলাফল সৃষ্টিতে ব্যস্ত রয়েছে। হোক সে কর্মব্যস্ত অথবা বেকার, সর্বাবস্থায় তার পক্ষে অথবা বিপক্ষে সৃষ্টি হচ্ছে একটি জগৎ। ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা, অভ্যস-প্রকৃতি আচার-ব্যবহার ইত্যাদির নিরিখে মানুষেরা মন্তব্য করে থাকে তার পক্ষে বা বিপক্ষে। শক্তির যথার্থ অথবা অযথার্থ প্রয়োগের ফলে তার কার্যাদি হয়তো সুচারুভাবে সম্পাদিত হয় অথবা বিগড়ে যায়। যে ধরনের বিষয়কে লক্ষ্য করে তার চেষ্টা সাধনা পরিচালিত হয় সে ধরনের বিষয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় তার অধিকার ।

অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই তার চারপাশে গড়ে যাচ্ছে একটি নিজস্ব জগৎ যা তার কৃতকর্মেরই সরাসরি ফলাফল। মানুষের সৃষ্ট এ জগৎটির একাংশ পৃথিবীর আলোতে দৃশ্যমান করছে নিজেকে। পক্ষান্তরে অপর অংশটি, অর্থাৎ বৈধ-অবৈধ হয়ার দিকটিও একটা ফলাফল অবশ্যই সৃষ্টি করছে যা আড়াল করে রেখেছে নিজেকে পরজগতে প্রকাশের অপেক্ষায়। আমাদের কর্মের দ্বিতীয় অংশটি মূলত কর্মের চারিত্রিক দিক যা ভিন্ন রকমের একটা ফলাফল সৃষ্টি করে যাচ্ছে, ধর্মীয় পরিভাষায় যাকে বেহেশত ও দোযখ বলা হয়। আমাদের মধ্যে প্রত্যেকেই প্রতি মুহূর্তে এ বেহেশত অথবা দোজখ নির্মাণ করে যাচ্ছে। আর যেহেতু মানুষকে এ-পৃথিবীতে পরীক্ষার উদ্দেশে রাখা হয়েছে , তাই এ-বেহেশত ও দোযখ মানুষের চোখের অন্তরালে রাখা হয়েছে। পরীক্ষার জন্য বেঁধে দেয়া সময় যখন শেষ হয়ে যাবে, এবং পূনরুত্থান দিবস চলে আসবে প্রত্যেককেই, তখন, তার নির্মিত জগতে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এখানে একটি প্রশ্ন জাগে : আমাদের কর্মের যখন একটি চারিত্রিক দিক আছে, তবে তা দৃষ্টিগ্রাহ্য না হয়ে দৃষ্টির অন্তরালে থাকছে কেন। ধরা যাক আমাদের পাশেই একটি বিল্ডিং এর নির্মাণ কাজ চলছে, এ কাজের একটি ফলাফল তো এই যে নির্মিত হয়ে বিল্ডিংটি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে যা আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এ-কাজটির অন্য আর-একটি দিক অর্থাৎ বিল্ডিংটি কি বৈধভাবে নির্মিত হচ্ছে না অবৈধভাবে. এ-দিকটির যদি কোনো ফলাফল বা পরিণতি সৃষ্টি হয়ে থাকে তবে তা কোথায়? এমন কি-ইবা পরিণতি থাকতে পারে যা ধরাছোঁয়ার বাইরে, দৃষ্টির অন্তরালে।

এ-প্রশ্নের উত্তর মানবকৃত্যের উল্লেখিত দুটি দিকের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে। কোনো কর্মের ঘটনাগত দিক প্রতিটি মানুষই দেখতে পায়। এমনকী ক্যামেরার চোখও তা ধরতে পারে। কিন্তু সে কর্মের চাত্রিক দিক দৃষ্টির আওতায় আসার মতো জিনিশ নয়, বরং এ-দিকটি কেবলই আঁচ করার, অনুভব করার। কর্মের এ-দুটি দিকের মধ্যখানে যে পার্থক্য তা অত্যন্ত স্পষ্ট করে ইঙ্গিত দিচ্ছে, উভয় প্রকার ফলাফল কীভাবে প্রকাশ পাওয়া উচিত। অর্থাৎ মানবকৃত্যের প্রথম দিকটির ফলাফল এ-পৃথিবীতেই দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়া উচিত যা আমরা স্পর্শ করে দেখতে পাবো, পক্ষান্তরে দ্বিতীয় দিকটির ফলাফল ওই জগতে প্রকাশ পাওয়া উচিত যা এখনো দৃষ্টির অন্তরালে। ঘটনা অনেকটা এ-রকম যে যেটা যেভাবে হয়া উচিত সেটা ঠিক সেভাবেই হচ্ছে । এখানে কেবল বিচার বুদ্ধির নিরেখে সম্ভাবনাময় একটি ঘটনার কথাই বলা হচ্ছে না, বরং এ-মহাবিশ্ব সম্পর্কে চিন্তাভাবনা মানুষকে এ-সিদ্ধান্তে উপনীত করছে যে এখানে প্রতিটি কর্মেরই দু’প্রকার ফলাফল রয়েছে। এখানে এমন কর্মফলও রয়েছে যা কর্ম সম্পাদনের পর তৎক্ষণাৎ দেখা যায়। আবার এমন কর্মফলও রয়েছে যা দৃষ্টির নাগালের বাইরে থাকা সত্ত্বেও অস্তিত্ববান। এ-মহাবিশ্বে এ ধরনের অদৃশ্য ফলাফলের উপস্থিতির বিষয়টি আজ দুর্বোধ্য কোনো বিষয় নয়। উদাহরণত আওয়াজের কথা ধরুন: আওয়াজ, সবাই জানে, কিছু তরঙ্গমালা যা চর্মচোখে দেখা যায় না। আমরা যখন কথা বলার জন্য জিহ্বা নাড়াই তখন আবহাওয়ায় একপ্রকার তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। আমাদের জিহ্বা নাড়ানোর ফলে এ তরঙ্গমালা আবহাওয়ার গায়ে এঁটে যায়। যখনই কেউ কথা বলে ডেউয়ের আকৃতিতে তা বাতাসে অঙ্কিত হয়ে যায় এবং তা বিরাজমান থাকে ক্ষয়রহিতভাবে।| এমনকী বিজ্ঞানীরা ধারনা করছেন আজ থেকে হাজার বছর পূর্বের কথা-শব্দ-বক্তব্য সবই বাতাসে ঢেউ-এর আকৃতিতে বিদ্যমান রয়েছে। যদি আমাদের কাছে এসব আওয়াজ ধরার কোন যন্ত্র থাকে তাহলে যেকোনো সময় অতীতের কথাসমূহ শোনার সূযোগ পাবো। আমাদের চারপাশে বাতাসের একটি আবরণ রয়েছে যাতে আমাদের প্রতিটি আওয়াজ মুখ থেকে বের হয়ার সাথে সাথে অঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে- যদিও আমরা আওয়াজ, অথবা আওয়াজটির বাতাসে অঙ্কিত হয়ে যাওয়া, কোনোটাই দেখতে পাই না ঠিক একইরূপে পরজগতও আমাদেরকে চারপাশ থেকে ঢেকে রেখেছে এবং আমাদের নিয়ত ও ইচ্ছাসমূহকে প্রতিনিয়ত রেকর্ড করে যাচ্ছে। পরজগতের পর্দায় আমাদের কৃত্যের নকশা অঙ্কিত হচ্ছে যা মৃত্যুর পর দৃষ্টিগ্রাহ্য হবে।

গ্রামোফোন যদি চালু থাকে এবং ডিস্ক তার উপর ঘুরতে থাকে তাহলে সুঁইয়ের স্পর্শ পাওয়া মাত্রই নিশ্চুপ বস্তুটি বাজতে শুরু করে। মনে হয় যেন সে এ-অপেক্ষাতেই ছিলো যে, কেউ যখন তার উপর সুঁই রেখে দেবে অবলীলায় সে বাজতে শুরু করবে। ঠিক একইরূপে আমাদের সমস্ত কর্মের রেকর্ড রাখা হচ্ছে, যখন সময় হবে তখন বিশ্বপ্রতিপালক তা চালু করে দিবেন, নিশ্চুপ রেকর্ড চলতে শুরু করবে। অবস্থা দেখে মানুষ বলতে থাকবে-

ما لهذا الكتاب لا يغادر صغيرة ولا كبيرة إلا أحصاها. سورة الكهف : 49

এ কেমন রেকর্ড, আমার ছোট বড়ো কোনো কিছুই তো এর হিসেব থেকে বাদ পড়েনি। (সূরা কাহ্‌ফ : ৪৯)

শেষ কথা

উপরে আমি যা বললাম তা আরো একবার ভেবে দেখুন। আপনার জীবন এক অন্তহীন জীবন, মৃত্যু এ জবীনের শেষ প্রান্ত নয় বরং দ্বিতীয় পর্বের প্রারম্ভ বিন্দু। মৃত্যু আমাদের দুই পর্বের মধ্যবর্তী সীমানা। বিষয়টিকে এভাবে বুঝুন যে কৃষক জমিনে ফসল বুনে, নিয়ম মাফিক চেষ্টা সাধনায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে, এক পর্যায়ে ফসল প্রস্তুত হয়। কৃষক তা কাটে, গোলায় তুলে, সারাবছরের খাদ্যের ব্যবস্থা করে। ফসল কাটার অর্থ ফসলের এক পর্ব শেষ হয়ে অন্য পর্বের শুরু হয়া। ইতোপূর্বে তার কাজ ছিলো ফসল বোনা ও যত্ন নেয়া এখন তার কাজ হবে ফসল গোলায় তুলা ও নিজের প্রয়োজন মিটানো। ফসল কাটার পূর্বে ছিলো চেষ্টাসাধনা ও পয়সা ব্যয়ের পালা আর ফসল কাটার পর শুরু হয় মেহনতের ফলভোগ ও তা থেকে উপকৃত হয়ার পালা। মানুষের জীবনের অবস্থাও ঠিক একই রকম। মানুষ এ-পৃথিবীতে পরজগতের ফসল বুনছে, যত্ন নিচ্ছে। আমাদের প্রত্যেকেরই পরজগতে একটি খামার রয়েছে যা হয়তো সে চাষ করছে, অথবা ফেলে রাখছে পতিত বিনা কর্ষণে। যারা কর্ষণ করছে তারা হয়তো এতে উত্তম অথবা অনুত্তম বীজ ফেলছে। বীজ ফেলে হয়তো রেখে দিচ্ছে অবহেলায় অথবা পরিচর্যা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সেখানে হয়তো তিক্ত ফলের গাছ লাগাচ্ছে অথবা রূপন করছে মজাদার ফলের বৃক্ষ। জমিনকে উর্বর করতে ব্যয় করছে সমগ্রশক্তি অথবা অপ্রাসঙ্গিক ব্যস্ততায় কাটাচ্ছে সময়। এ-ফসল তৈরির সময়সীমা মৃত্যুর পূর্বমূহুর্ত পর্যন্ত। মৃত্যু পরকালের ফসল কাটার দিন। যখন এ-পৃথিবীতে আমাদের চোখ বন্ধ হয় তখন দ্বিতীয় জগতে গিয়ে তা খোলে। সেখানে যার যার খামার দৃষ্টিতে আসে। জীবনভর কর্ষিত অথবা ফেলে রাখা জমিন নজরে আসে আমাদের সবার। শুরু হয় ফসল কাটা, গোলায় তুলা ও তাত্থেকে উপকৃত হয়ার পালা। এ-সময় কেবল সে ব্যক্তিই ফসল কাটে যে ইতোপূর্বে ফসল বুনেছে এবং সে ফসলই কাটে যা সে বুনেছে। প্রত্যেক কৃষকই জানে যে তার গোলায় ঠিক ততটুকু ফসলই আসবে যতটুকু সে মেহনতমজদুরি করেছে। তদ্রূপভাবে পরকালেও মানুষ ঠিক ততটুকুই পাবে যতটুকু সে চেষ্টা সাধনা করেছে। মৃত্যু, চেষ্টা সাধনার সময় শেষ হয়ার সর্বশেষ ঘোষণা , আর পরকাল নিজের চেষ্টাসমূহের ফলাফল লাভের শেষ জায়গা। মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার চেষ্টা-সাধনার না কোনো সুযোগ রয়েছে, না রয়েছে পরকালীন জীবন শেষ হয়ার কোনো সম্ভাবনা। কতইনা কঠিন এ-বাস্তবতা। যদি মানুষ মৃত্যুর পূর্বে এব্যাপারে সজাগ হতো! কারণ , মৃত্যুর পরে এব্যাপারটি বুঝে আসলে তখন আর কিছুই করার থাকবে না। মৃত্যুর পর সতর্ক হয়ার অর্থ তো শুধু এই যে, মানুষ কেবল এই বলে আফসোস করে করে সময় কাটাবে যে, সে অতীতে কত বড় ভুলই-না করেছে। এমন এক ভুল যা শুধরানোর সামন্যতম সুযোগ তার সামনে নেই। মানুষ তার পরিণাম সম্পর্কে গাফেল। পক্ষান্তরে কালস্রোত তাকে অতি দ্রুত ওই সময়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে যখন ফসল কাটার লগ্ন চলে আসবে। মানুষ এ-পৃথিবীর তুচ্ছ ফায়দাসমূহ অর্জনের জন্য ব্যস্ত রয়েছে এবং মনে করছে, সে কাজ করছে প্রচুর। পক্ষান্তরে সে কেবল তার মূল্যবান সময়ই নষ্ট করে যাচ্ছে। মানুষের সামনে বিরাট সুযোগ রয়েছে যা ব্যবহার করে সে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারে। কিন্তু মানুষ কাঁদামাটি নিয়ে খেলছে। তার প্রভু তাকে বেহেশতের দিকে ডাকছেন যা কল্পনাতীত নেয়ামত সামগ্রীতে ভরপুর , কিন্তু মানুষ কয়দিনের মিথ্যা আয়েশে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে আছে। মানুষ মনে করছে যে সে লাভ করছে, কিন্তু মূলত সে কেবলই হারাচ্ছে। দুনিয়াতে বাড়ি বানিয়ে সে মনে করছে সে জীবন গড়ছে কিন্তু আসলে সে বালির দেয়াল দাঁড় করাচ্ছে যা কেবল কিছুক্ষণ পর ধ্বসে পড়ার জন্যই দাঁড়াচ্ছে। হে মানুষ ! তুমি নিজেকে জানো, নিজেকে আবিষ্কার করো। গভীর মনোনিবেশের সাথে খুঁটিয়ে দেখ তুমি কি করছ, তোমার কী করা উচিত। মানুষকে সফলকাম হয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে কিন্তু মানুষ অসতর্ক হয়ে নিজের ব্যর্থতা নিজেই ডেকে আনছে।

পরকাল ভাবনা (পর্ব :১)

সংকট

আধুনিক বিশ্বে মানুষের সবচেয়ে বড় গুরুত্বের বিষয় কোনটি ? কোন বৈঠকে এ-প্রশ্ন করা হলে একেক জন একেক উত্তর দিবেন; কেউ বলবেন, ব্যাপকবিধ্বংসী অস্ত্রের উৎপাদন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মজুদ কীভাবে ঠেকানো যায় এটাই আধুনিক বিশ্বের সমধিক গুরুত্বের বিষয়। কেউ বলবেন, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ প্রতিহত করাই বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। আবার কেউ বলবেন, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠ বন্টন নিশ্চিত করণই আজকের বড় সমস্যা। এর অর্থ, মানুষ এখনো অন্ধকারে রয়েছে তার পরিচয় বিষয়ে; আবিষ্কার করতে পারেনি নিজের অস্তিত্বের ধরন-ধারণ; পারলে ভিন্নরকম হত সবারই উত্তর। সবাই বলতো, সবচেয়ে বড় সমস্যা আধুনিক মানুষের পরিচয় বিস্মৃতি। মানুষ তার মূল পরিচয় ভুলে গেছে বেমালুম; নশ্বর ইহজগৎ ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে অবিনশ্বর পরজগতে, যেখানে তাকে দাঁড়াতে হবে প্রতিপালকের সামনে যাপিত জীবনের হিসেব দিতে, এ-বিষয়টি বিদায় নিয়েছে তার মস্তিষ্কের সচেতন অংশ থেকে; অন্যথায় এ-খন্ডকালিক অস্তিত্বের জগতকে নয়, অনন্ত পরকালকে, স্রষ্টার মুখোমুখী হওয়াকে, স্বর্গ-নরকের সম্মুখীনতাকে সবচেয়ে বড় বিষয় বলে মনে করতো সে। আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন :

بل تؤثرون الحياة الدنيا والآخرة خير وأبقى. سورة الأعلى : 16-17

কিন্তু তোমরা পার্থিব জীবনকে পছন্দ করে থাকো। অথচ আখেরাতের জীবনই উত্তম ও চিরস্থায়ী। (সূরা আ’লা ১৬-১৭)

আল্লাহ ও পরকালে মানুষের বিশ্বাস সম্পূর্ণ উঠে গেছে, একথা বলছি না। এখনো পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাসীদের দলভুক্ত। কিন্তু এ-বিশ্বাসের শিহরণ ঝিমিয়ে পড়েছে বর্ণনাতীতভাবে মানুষের অন্তর ও বহির্জগতে। মানুষের সচেতন মেধার অংশ হিসেবে মোটেই মন্থিত নয় এ-অতি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাসটি। এ-পৃথিবীর জীবনে, অর্থবিত্ত যশ-জৌলুসের পাহাড় গড়ে কীভাবে উন্নতির চরমে পৌঁছানো সম্ভব সে স্বপ্নেই বিভোর থাকে মানুষ দিবস-রজনী। ইরশাদ হচ্ছে :

ألهاكم التكاثرحتى زرتم المقابر- سورة التكاثر : 1-2

প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকেমোহচ্ছন্ন রাখে। যতক্ষণ না তোমরা সমাধিসমূহে উপস্থিত হচ্ছ। (সূরা তাকাছুর :১-২)

বিশ্বের মধ্যাকর্ষণ শক্তি বিলুপ্তপ্রায় এবং ঘন্টায় ছ’হাজার মাইল বেগে আমাদের পৃথিবী ধেঁয়ে চলেছে সূর্যের দিকে, কোন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে এধরনের নিশ্চিত কোনো সংবাদ পরিবেশিত হলে উদ্বেগ উৎকন্ঠায় হুমড়ি খেয়ে পড়বে একে অপরের ওপর, শুরু হবে স্বজনদের কাছে ফিরে যাওয়ার অভাবিতপূর্ব প্রতিযোগিতা, প্রচন্ড দৌড়ঝাঁপ; কেননা এ ধরনের সংবাদের অর্থ-কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিপর্যস্ত হবে পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর, সমস্ত জনপদ জৈব ও জড় সব কিছুই। অবসান ঘটবে জীবন বৈচিত্রের, এ-নিসর্গলোকের।

এ ধরেনের কোনো সংবাদ আমাদের কানের পাতায় আঘাত হানছে না বলে নিজেদেরকে মনে করছি অনেক নিরাপদ, কিন্তু একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে কষ্ট হবে না, এর থেকে ভয়ংকরতম এক পরিণতির দিকে নিরন্তর ছুটে চলেছে আমাদের এ পৃথিবী। কিন্তু এ-ব্যাপারে উদ্বেগ উৎকন্ঠার স্পর্শ কাউকে পেয়েছে বলে মনে হয় না। প্রশ্ন হতে পারে- কী সেই সঙ্গিন পরিণতি যার ভয়াবহতায় কাতর হতে হবে আমাদের ? তা হলো মহা-প্রলয়দিবসের ভয়াবহতা যা সুনির্ধারিত হয়ে আছে মহাবিশ্বের জন্মলগ্ন থেকেই। যার কঠিন থাবা থেকে রেহাই পাবে না কেউ; পাওয়ার আদৌ কোনো সুযোগও নেই। তিক্ত সত্য হলো, মানুষ এ-দুর্লঙ্ঘ পরিণতির দিকে এগোচ্ছে অত্যন্ত দ্রুত। বিশ্বাসের জগতে অধিকাংশ মানুষ এ-বিষয়টিকে মানে, কিন্তু বাস্তবে এমন লোকের উপস্থিতি খুব কমই যারা প্রদীপ্ত চেতনা নিয়ে এ-বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। যদি গোধূলিলগ্নে আপনি কোন জনাকীর্ণ বাজারের ধারে দাঁড়িয়ে যান, জানতে চেষ্টা করেন কী জন্য মানুষের এই ভিড়, তাহলে সহযেই বুঝতে পারবেন কিসের পেছনে মানুষের এই অনন্ত দৌড়ঝাঁপ, আনাগোনা। একটু ভেবে দেখুন কী জন্য বাজারে যানবাহনের চলাচল, দোকানদার কী উদ্দেশে বিচিত্র পণ্যে সাজিয়েছে তার দোকান। একটু মনোযোগ দিয়ে দেখুন, ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ কোথায় যাচ্ছে? তাদের কথাবার্তার বিষয়বস্তু কী? কী জন্য একে অন্যের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করছে? কোন জিনিস মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করছে? মানুষের উত্তম-যোগ্যতাসমূহ কোথায় ব্যয় হচ্ছে? তাদের অর্থবিত্ত কোথায় খরচ হচ্ছে? কোন জিনিসের অভাব তাদের নিদ্রা হারাম করে দিচ্ছে? মানুষ কী নিয়ে বেরুচ্ছে ? কি নিয়ে ফিরে আসছে? মানুষের এই অচ্ছেদ ব্যস্ততা, তাদের মুখ-নিঃসৃত কথামালা, তাদের প্রত্যঙ্গের নড়াচড়া নিরীক্ষা করে যদি উল্লেখিত প্রশ্নের উত্তর ঘেঁটে বের করতে চান তাহলে সহযেই বুঝে যাবেন কিসের পেছনে মানুষের এই উন্মত্ততা, কোন বিষয়কে মানুষ তার জীবনের সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয় হিসেবে করে রেখেছে সাব্যস্ত।

স্বীকার করতেই হয়, শহরে-বন্দরে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন আনাগোনা, ব্যস্ততম পথে অনবরত যাতায়াত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলছে--- মানুষ তার বসু্তনির্ভর খায়েশ ও রক্তমাংশের প্রয়োজন মেটানোকেই জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে সাব্যস্ত করে নিয়েছে। পরজগৎ নয় বরং ইহজগতের বিচিত্র চাহিদা পূরণকেই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে ধরে নিয়েছে। মানুষকে উৎফুল্ল দেখালে বুঝে নিতে হবে তার কোনো পার্থিব প্রয়োজন পূরণ হয়েছে। আজকের প্রয়োজন, আজকের সুযোগ-সুবিধা, আজকের ক্ষণস্থায়ী আরাম-আয়েশ ইত্যাদি একটি বিশেষ মাত্রায় অর্জন করতে পারাটাই যেন জীবনের সফলতা। এটাই সে বিষয় যার পেছনে ব্যয় হচ্ছে মানুষের সর্বোত্তম যোগ্যতা, ক্ষরিত হচ্ছে প্রদত্ত শক্তি, সাহস। আসছে কিয়ামত দিবসের ভাবনা কারও নেই। প্রতিটি ব্যক্তির ম্যারাথন দৌড়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য বর্তমান নিসর্গ। আল্লাহ্‌ তা‘আলা কুরআনে কারীমে কাফেরদের বক্তব্য নকল করে বলেন :

إن هي إلا حياتنا الدنيا نموت و نحيا وما نحن بمبعوثين - المؤمنون : 37

একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, আমরা যদি বাঁচি এখানেই এবং আমরা পুনরুত্থিত হবনা। (সূরা মুমিনূন : ৩৭)

বড় শহরগুলোর অবস্থাই যে কেবল এরকম, কথা ঠিক নয়। বরং যেখানেই রয়েছে মানুষের বসতি সেখানেই এ-অবস্থা অত্যন্ত প্রকটভাবে দৃষ্টিগ্রহ্য। আপনি যাকেই টোকা দিবেন, পরখ করতে চাইবেন, তাকেই এ-বিষয়টির বন্দনায় নিষ্ঠাবান পাবেন। কি পুরুষ কি নারী, কি আমীর কি গরীব, কি যুবক কি বৃদ্ধ, কি শহুরে কি গেঁয়ো, কি ধার্মিক কি অধার্মিক সকলেই অভিন্ন পথের তীর্থযাত্রী। আজকের মানুষের সবচাইতে বড় আকুতি, এই নিসর্গে যা কিছু লভ্য সবই লুফে নিতে হবে দুহাত ভরে। ‘ব্যয় করো এর পিছনেই তোমার সর্ব শ্রেষ্ঠ যোগ্যতা, মশগুল রাখো এ চিন্তাতেই তোমার দিবস-রজনী ’ এ-শ্লোগানের পদধ্বনি যেন নিরন্তর ভেসে আসছে চতুর্দিক থেকে। অবস্থা দেখে মনে হয়, ইহকালীন ভোগ-সম্ভোগই একমাত্র দেবতা যার নজরানায় ঈমান ও আত্মোপলদ্ধি কুরবানী করতেও মানুষ প্রস্তুত রয়েছে। মানুষ এখানেই সবকিছু পেয়ে যেতে চায়, তা যেভাবেই হোক, যেকোনো মূল্যেই হোক। কিন্তু এ-ধরনের সমস্ত সফলতা, নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইহকালীন সফলতা। পরকালে এসমস্ত সফলতার থোরাই মূল্য রয়েছে। যে ব্যক্তি তার সমকালের নিসর্গকে সাজাতে ব্যস্ত সে পরকাল বিষয়ে নিঃসন্দেহে উদাসীন। যে ব্যক্তি তার যৌবনে বার্ধক্যের জন্য কিছুই সঞ্চয় করেনা, এ ব্যক্তির উদাহরণ ঠিক তারই মতো। ফলে বয়সের ভার বহনে সে যখন অক্ষম হয়ে পড়ে, শ্লথ হয়ে আসে গতিময়তা, হারিয়ে বসে কর্মক্ষমতা, তখন সে আঁচ করতে পারে : তার দাঁড়াবার মতো কোন জায়গা নেই, নেই মাথা গোঁজার কোন ঠাঁই, গা ঢাকার কোন কাপড়, শোবার কোন বিছানা। কিন্তু বয়স তখন দীর্ঘ পথ মাড়িয়ে এসে শ্রান্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি, গাত্র ঢাকার কাপড়, শোবার বিছানা, দু’মুঠো অন্নের ব্যবস্থা ইত্যাদির পেছনে শ্রম দেয়ার কোন শক্তি সাহসই তার পতিত ছন্দের শরীরে আর থাকে না। সে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মহাবিশ্বের তাবৎ বিষাদ বুকে ধারণ করে হয়তো কোনো বৃক্ষের শিকড়ে মাথা রেখে আকাশের বিশালতা মাপতে শুরু করে। কোন দেয়ালের গা ঘেষে উদাস দাঁড়িয়ে থাকে, অথবা মুখ থুবরে পড়ে থাকে; উদভ্রান্ত কুকুরের দল তাকে ঘিরে ঘেউ ঘেউ করে, শিশুরা ছুড়ে মারে অজস্র পাথর। আমরা নিজ চোখে এমন বহু ঘটনা দেখে যাচ্ছি, যা থেকে কিঞ্চিৎ হলেও আঁচ করা যায়, পরকালের জন্য যে ব্যক্তি কিছু উপার্জন করছে না তার পরিণতি কত ভয়াবহ হবে। তবে এ বিষয়টি আমাদের মধ্যে কোন চাঞ্চল্যই সৃষ্টি করেনা। আমাদের অনন্ত স্থবিরতায় সৃষ্টি হয় না কোন আন্দোলন। আমারা প্রত্যেকেই বরং আমাদের ‘আজ’কে নির্মাণে বড় ব্যস্ত। আগামীকালের জন্য উদ্বিগ্ন হচ্ছি না মোটেই। যুদ্ধের সময় যদি উৎকট আওয়াজে ঘোষিত হয়, শত্রু পক্ষের বিধ্বংসী বিমানসমূহ ধেঁয়ে আসছে ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালাতে, তাহলে সবাই কোনো আশ্রয়কেন্দ্রে দৌড়ে পালাবে। জনাকীর্ণ রাজপথ নিমিষেই ঢাকা পড়বে শুনশান নিরবতার পুড়ো চাদরে। যদি কেউ এ অবস্থায় নিথর নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে, যদি এমন পরিস্থিতিতেও কোনো চঞ্চলতা ছন্দ খুঁজে না পায় কারও শরীরে, অন্তরে, তাহলে সবাই তাকে নির্ঘাৎ পাগল বলবে, একথা দ্বিধাহীনভাবেই বলা যায়। এ-ধরনের উৎকন্ঠা ও চঞ্চলতা এ-পৃথিবীর একটি ছোট বিপদকে কেন্দ্র করে ঘটে থাকে। তবে এ-বিপদের থেকেও হাজারগুণে ভয়ংকর ,বীভৎসতম আর এক নিশ্চিত বিপদ আসছে, যার ঘোষণা স্রষ্টা নিজেই দিয়েছেন। বিশ্বপ্রতিপালক তাঁর প্রেরিত পুরুষদের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন - মানুষ যেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে, অন্যের অধিকার যথার্থভাবে আদায় করে দেয়, একমাত্র তাঁরই মর্জি মোতাবেক জীবনযাপন করে; না করলে মুখোমুখি হতে হবে কঠিন শাস্তির। ইরশাদ হয়েছে :

ومن أعرض عن ذكري فإن له معيشة ضنكا ونحشره يوم القيامة أعمى. سورة طه :124

যে আমার স্মরণ হতে বিমুখ তার জীবনযাপন সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন উত্থিত করব অন্ধ হিসেবে। [ সূরা তাহা: ১২৪]

এমন শাস্তি যা অভাবিত, মর্মন্তুত, যা কখনো রহিত হবার নয়, এবং যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার থাকবে না কোনো সুযোগ। বিশ্ব-প্রতিপালকের এ-ঘোষণা প্রায় সবার কর্ণকুহরেই অনুরিত হয়েছে। মানুষও কোন-না-কোন ভঙ্গিতে এ-বিষয়ে স্বীকারোক্তিও দিয়েছে। কিন্তু মানুষের অভ্যন্তর জগতে নজর দিলে, তাদের অবস্থা একটু মনোযোগসহ পর্যবেক্ষণ করে দেখলে বুঝা যাবে যে, বিষয়টি আদৌ কোনো গুরুত্ব পায়নি তাদের অন্তরে, বাহিরে। তারা বরং এর উল্টো ইহকালীন কল্যাণ লাভের উদ্দেশে এমনসব কাজ করে যাচ্ছে যা কখনো করা উচিত ছিলনা। জীবনের বিচিত্র স্রোতধারা নিষিদ্ধ অঞ্চলের দিকে কেবলই ধাবমান অত্যন্ত নির্বোধভাবে। অন্যকিছু নিয়ে ভেবে দেখার ফুরসত যেন কারো নেই। সামরিক বাহিনীর বিপদ সংকেতের অংশত শুনতে পেলেও দিশেহারা হয়ে ছুটতে থাকে সবাই অজানা গন্তব্যের দিকে, পক্ষান্তরে বিশ্ব-প্রতিপালক যে বিপদের ঘোষণা দিলেন সে ব্যাপারে কাউকে সামান্যতম উদ্বিগ্ন বলে মনে হয় না। ঐশী বিপদঘন্টা শুনে নিরাপদ-আশ্রয়ের খুঁজে ছুটে যাওয়ার আগ্রহ যেন কারুরই নেই।

এর কারণ কী? সামান্য মনোযোগ দিলেই আমরা তা আঁচ করতে পারি। এর কারণ, সামরিক বাহিনীর হেড-কোয়ারটার থেকে ভেসে-আসা সতর্কসংকেত মানুষ আমলে আনছে, কেননা তা এই মাটির পৃথিবীর সাথে সম্পৃক্ত, যেখানকার ঘটনাসমূহের ফলাফল তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ পায়, দেখা যায়, স্পর্শ করা যায়। এর বিপরীতে প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যে সতর্কসংকেত এসেছে তা মৃত্যু-পরবর্তী-জগতের বিষয়। আমাদের ও সে বিপদের দৃষ্টিগ্রাহ্যতার মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যুর দেয়াল। এ-দেয়ালে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে আমাদের দৃষ্টি, দেখা যাচ্ছে না ওপারের বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের বহর, দেখা যাচ্ছে না বোমা, গ্রেনেড, আগুনের কুন্ডলী। এইজন্যে বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে উঠলে সাথে সাথে মানুষ তা বুঝে নেয়, সতর্ক হয়, তা বিশ্বাস করে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয় পানে ছুটে চলে অভাবিত চঞ্চলতায়। কিন্তু আল্লাহ যে বিপদের সংকেত দিয়েছেন, তা মানুষের মধ্যে দানা পরিমাণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করছে না। আল্লাহ আমাদেরকে কেবল দু’টো চর্মচোখই দান করেন নি যা স্থাপিত আমাদের চেহারার অগ্র-ভাগে। বরং তিনি আমাদেরকে দিয়েছেন আরেকটি চক্ষু যার দৃষ্টিক্ষমতা আয়ত্বে নিয়ে আসতে পারে বহু দূরের বিষয়। এমনকি মোটা চাদরে ঢাকা পদার্থকেও এ-চোখ দেখে নিতে পারে। এ-চোখ হলো বুদ্ধির চোখ। এ-তৃতীয় চোখটির অব্যবহারই মানুষের বিশ্বাসহীনতার মূল কারণ। মানুষ তার চর্ম চোখে যা কিছু দেখে সেটাকেই বাস্তব মনে করে। পক্ষান্তরে বুদ্ধির চোখকে কাজে লাগালে আমরা দেখতে পাবো, যা আমাদের চর্ম-চোখের সামনে নেই তা বহুমাত্রায় বেশি বিশ্বাসযোগ্য যা আমাদের চোখের সামনে রয়েছে তার তুলনায়। যদি প্রশ্ন করা হয়, এমন একটি বাস্তব বিষয়ের নাম বলুন যা সকলেই সমানভাবে বিশ্বাস করে, তাহলে সবাই এক কন্ঠে বলবে : মৃত্যু। মৃত্যু এমন একটি বাস্তবতা যা অস্বীকার করার ক্ষমতা এখনো কারো হয় নি; কখনো হবে বলে মনে হয় না। মানুষ সমানভাবে এ-ও বিশ্বাস করে যে, যে কোনো মূহুর্তে মৃত্যু কড়া নাড়তে পাড়ে তার অস্তিত্বের দরজায়। তবে অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, মৃত্যু যখন আসে তখন মৃত্যুমুখী ব্যক্তি সাধারনত যা করে তাহলো ছেলে-সন্তানের ভাবিষ্যৎ নিয়ে উৎকন্ঠিত হওয়া। অর্থাৎ আমার মৃত্যুর পর ছেলে-মেয়েদের কী হবে? কীভাবে চলবে লেখাপড়া অথবা ঘরসংসার? ইত্যাদি। অতীত জীবনের যে কয়টি বছর মাড়িয়ে এসেছে সেগুলোয় যদি মানুষ ব্যস্ত থেকে থাকে নিজেকে নিয়ে, তাহলে মৃত্যুর সময় ব্যস্ত হয়ে পড়ে ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ছেলে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে তো সে সারাটা জীবনই করেছে উৎসর্গ। মৃত্যুর সময়ও তার হৃদয়ের প্রতিটি ভাঁজে বিরাজ করছে ছেলেসন্তানের পার্থিব ভবিষ্যতের ভাবনা। মত্যু-পরবর্তী সময়ে তার নিজের কী হবে না হবে সে বিষয়ে তাকে এখনো মনে হচ্ছে সমানভাবে উদাসীন। মনে হয় যেন মৃত্যুর পর কেবল তার ছেলে সন্তানেরই অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকবে; তার নিজের অস্তিত্বের চিহ্ন মাত্র থাকবে না কোথাও। অবস্থা দেখে মনে হয় - মৃত্যুর পর আরো-একটি জীবন রয়েছে এ বিষয়টি মানুষের অনুভূতির জগতে জাগ্রত নেই আদৌ।

আসলে মৃত্যুর পর মানুষ যখন সমাহিত হয় তখন মূলতঃ সে সমাহিত হয় না, চলে যায় আর-এক জগতে, এ-সত্যটি অনুধাবন করলে ছেলেপুলের নৈসর্গিক ভবিষ্যৎ নয়, নিজের পরকালীন ভবিষ্যৎ নিয়েই উৎকন্ঠিত হতো সবচেয়ে বেশি, মৃত্যুর পর আমার কী হবে ? এভাবনায় অস্থির হতো সবাই।
মৃত্যুর পর মানুষের অস্তিত্ব অবলুপ্ত হয়ে যায় না, এর সাথে সংযোজন ঘটে ভিন্নতর এক মাত্রার। মানুষের প্রবেশ ঘটে অন্যএক জীবনে যা বর্তমান জীবনের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তব, অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ-সত্যটি, বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ-সে হোক ধার্মিক বা অধার্মিক-ভুলে গেছে বেমালুম।

মৃত্যু-পরবর্তী-জীবন সম্পর্কে দু’ভাবে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এক. প্রতিটি মানুষই মৃত্যুর পর মাটির সাথে মিশে যায়, আর তাই বুঝে আসে না কীভাবে সে জীবনপ্রাপ্ত হবে দ্বিতীয়বার।

দুই. মৃত্যু-পরবর্তী-জীবন আমাদের দৃষ্টির অন্তরালে। আজকের পৃথিবীকে তো সবাই স্পর্শ করছে, চোখে দেখছে। কিন্তু পরবর্তী জগতকে কেউ কখনো দেখেনি। এজন্য আমাদের বিশ্বাস হতে চায় না, এ জীবনের পর অন্য আরো-একটি জীবন রয়েছে, যে জীবন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা সবারই কর্তব্য। তাহলে আসুন পরকালীন জীবন সম্পর্কে কিছু আলোচনা করে দেখা যাক। আমার যখন মৃত্যু হবে, নিশ্চিহ্ন হবে আমার শরীর মৃত্তিকাগর্ভে অথবা অন্য কোথাও এরপর আবারও কী ফিরে আসবে আমাতে জীবন স্পন্ধন? এ-প্রশ্নটি এভাবে নির্দিষ্ট করে হয়তো খুব কম মানুষই নিজেকে করে থাকে। মৃত্যুর পর এক নতুন জীবনের মুখোমুখী হতে হবে এ কথায় যারা বিশ্বাস করে তাদের হৃদয়ের মণিকোঠায় এ-বিশ্বাসটি অবচেতন অবস্থায় পড়ে থাকে। যে-ব্যক্তি পরবর্তী জীবন সম্পর্কে উদাসীন, উৎকন্ঠিত নয়, সে তার আচরণে এ-কথাই প্রমাণ করে যাচ্ছে যে সে পরকাল বিষয়ে সন্দিহান। তবে ঐকান্তিকভাবে ভেবে দেখলে অত্যন্ত সহজেই এ-বষয়টির নিগূঢ় বাস্তবতা আবিষ্কার সম্ভব হয়। কেননা আল্লাহ তা‘আলা যদিও পরজগতকে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে রেখেছেন, কিন্তু তিনি সমগ্র পৃথিবী জুড়ে এমনসব নিদর্শন ছড়িয়ে দিয়েছেন যাতে ভেবে দেখলে পরকালীন সকল বাস্তবতা আমাদের বুঝতে সহজ হয়। উন্মুক্ত হয়ে যায় অনেক কিছুই। আসলে এ-মহাবিশ্ব একটি বিশাল দর্পণ যাতে প্রতিবিম্বিত হয়েছে পরবর্তী জগতের আকৃতি-প্রকৃতি। জন্মের দিন আমার শরীরের যে অবস্থা-আয়তন ছিল, বর্তমানে তা বহু পরিবর্তিত হয়ে শক্ত সুঠাম হয়েছে, দৈর্ঘে-প্রস্থে বেড়েছে। আসলে মানুষের শুরু অতি-সামান্য এক পদার্থ থেকে যা মাতৃগর্ভে বড় হয়ে মানুষের আকৃতি ধারণ করে। মাতৃগর্ভের বাইরে এসে পরিপক্কতা অর্জন করে শক্ত সবল ব্যক্তিতে পরিণত হয়। খালি চোখে দেখা যায় না এমন একটি সামান্য পদার্থ থেকে বেড়ে ছ’ফুট লম্বা মানুষে পরিণত হওয়া এমন একটি ঘটনা যা প্রতিদিনই এ-পৃথিবীতে ঘটছে। আমাদের শরীরের অংশসমূহ যা অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরমাণুর আকারে ভূ-গর্ভে বিক্ষিপ্ত হয়ে যাবে তা পুূনর্বার মানুষের আকৃতি ধারণ করতে-পারাটা বুঝে না আসার মতো কোনো বিষয় নয়। এ-পৃথিবীতে চলমান প্রতিটি মানুষই মূলতঃ অসংখ্য পরমাণুর সমন্বয় যা একিভূত হয়ে মানুষের রূপ পরিগ্র করার পূর্বে জমিন ও বায়ুমন্ডলের বিশালতায় ছড়িয়ে থাকে বিক্ষিপ্ত আকারে, যা ঐশী প্রক্রিয়ায় পরিণত হয় মানুষের শরীরের অংশে। আমাদের মৃত্যুর পর শরীরের পরমাণুসমূহ বাতাসে-জমিনে ছড়িয়ে পড়ে। আবার যখন স্রষ্টার ইচ্ছা হবে একিভূত হবে যেমনটি হয়েছিল প্রথমবার। প্রথমে একবার যে ঘটনা ঘটেছে তার পুনরবৃত্তি ঘটায় আশ্চর্যের কিছু নেই ; থাকার কোনো অর্থও হয় না। জীবনের পুনরাবৃত্তি ঘটা অত্যন্ত সহজ ব্যাপার। এর উদাহরণ জড়জগতে বহু রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষাকালে আমরা দেখি, লতাগুল্ম, গাছপালা যৌবনপ্রাপ্ত হয়, পৃথিবীর রূপলাবন্যে বিচিত্র মাদকতা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর আবার শুকনো মৌসুম আসে। যেখানে ছিলো সবুজের মাতামাতি সেখানে দেখা দেয় ধূসরতা। নেতিয়ে পড়ে সবকিছু। শুকিয়ে ঝড়ে যায় বহু লতাগুল্ম। এভাবে একটি জীবন শ্যামলতায় অবগাহন করে আবার ঝরে যায়, মৃত্যু বরণ করে। কিন্তু পরবর্তী বছর যখন আবার বর্ষা শুরু হয়, বৃষ্টি নেমে আসে, তখন আবার জমিনে প্রাণ ফিরে আসে, জীবিত হয় এতদিন যা ছিল মৃত। শুকনো জমিনে আবারও হিন্দোলিত হয় দ্বিগন্ত-জোড়া সবুজ। মানুষকেও মৃত্যুর পর অনেকটা এভাবেই জীবিত করা হবে পুনর্বার। মৃত্যুপরবর্তী জীবন সম্পর্কে সন্দেহ এজন্যও জাগে যে, আমরা আমাদের অস্তিত্বটাকে শরীরী অবকাঠামোর আলোকে ভাবি। মনে করি বাইরে চলমান যে শরীর, সেটাই মানুষের মূল বাস্তবতা বা অস্তিত্ব। তাই যখন এই শরীরী খাঁচা ভেঙ্গে পড়ে, পঁচে-গলে মাটির সাথে মিশে যায় তখন ভাবি সবকিছুর বুঝি অবসান ঘটলো। আমরা দেখি একটা জলজ্যান্ত মানুষ মূহুর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, চিরকালের জন্য চুপ হয়ে যাচ্ছে। চলমান শরীর নিথর নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। তার সমস্ত যোগ্যতা, শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তাকে মাটির নিচে চাপা দিয়ে রেখে দেয়া হচ্ছে, অথবা কোনো কোনো সমপ্রদায়ের প্রথা অনুযায়ী জ্বালিয়ে ভস্ম করে দরিয়ায় ভাসিয়ে দেয়া হচ্ছে। যাকে মাটির নিচে সমাহিত করা হচ্ছে, ক’দিন যেতে না যেতেই তার শরীরের বিভিন্ন অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে জমিনের সাথে মিশে যাচ্ছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তার শরীরী অস্তিত্ব। একটি জলজ্যান্ত মানুষের এভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রতি মুহূর্তেই ঘটছে। যে মানুষটি এভাবে শেষ হয়ে গেলো সে কীভাবে আবার জীবনে ফিরে যাবে? এ যেন এক কঠিন ধাঁধাঁ। তবে একটু ভেবে দেখলে বুঝতে পারবো যে আমাদের আসল অস্তিত্ব এই শরীরী অস্তিত্ব নয়। আমাদের আসল অস্তিত্ব অভ্যন্তর মানস যা ভাবে, চিন্তা করে, শরীরকে চালায়। যার উপস্থিতি শরীরকে রাখে সজীব-সতেজ-চলমান এবং অনুপস্থিতি তাকে করে মৃত, নিশ্চল। প্রকৃত অর্থে মানুষ বিশেষ কোন শরীরের নাম নয়। মানুষ ওই আত্মার নাম যা শরীরের মধ্যে বিরাজমান থাকে। আর আমরা জানি, শরীর অতি-ক্ষুদ্র পরমাণু দিয়ে গঠিত যাকে জীবকোষ (Living Cell) বলে। মানুষের শরীরে কোষের একই অবস্থান যা একটি বিল্ডিং- এ ইটের। আমাদের শরীরী বিল্ডিং এর এই ইটগুলো, অথবা যাকে পারিভাষিক অর্থে কোষ বলে থাকি আমাদের কাজের সময়, নড়াচড়ার সময়, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। খাদ্যের মাধ্যমে আমরা এর ক্ষতিপূরণ করে থাকি। খাদ্য হজম হয়ে বিভিন্ন প্রকার কোষের জন্ম দেয় যা ক্ষয়প্রাপ্ত কোষের জায়গা দখল করে। মানুষের শরীর এভাবে সার্বক্ষণিকভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। এ-কাজ প্রতিদিনই ঘটে, এবং কিছুদিন পর সমগ্র শরীর সম্পূর্ণ নতুন শরীরে রূপান্তরিত হয়।