প্রথমত: বিদআতের সংজ্ঞা:
আভিধানিকভাবে বিদআত শব্দটি البدع শব্দ হতে গৃহীত, যার অর্থ হলো পূর্ববর্তী কোন উদাহরণ ছাড়াই কোন কিছু সৃষ্টি বা আবিষ্কার করা। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ﴿১১৭﴾ سورة البقرة
‘তিনিই আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিকারী’
অর্থাৎ পূর্ববর্তী কোন নমুনা ছাড়াই এত-দুভয়ের তিনি সৃষ্টিকর্তা। আল্লাহ অন্যত্র আরো বলেন:
ُ قُلْ مَا كُنْتُ بِدْعًا مِنَ الرُّسُلِ ﴿৯﴾ سورة الأحقاف
‘বলুন, আমি কোন নতুন রাসূল নই’
অর্থাৎ আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তার বান্দাদের প্রতি বার্তা-বাহক প্রথম রাসূল নই, বরং আমার পূর্বে আরো বহু রাসূল আগমন করেছেন। বলা হয়ে থাকে, ‘অমুক ব্যক্তি একটি বেদআত উদ্ভাবন করেছে’ অর্থাৎ এমন এক পন্থা প্রচলন করেছে যা তার পূর্বে আর কেউ করেনি।
উদ্ভাবন দু’ প্রকার:
১. প্রথাগত উদ্ভাবন: যেমন আধুনিক আবিষ্কৃত বস্তুসমূহের উদ্ভাবন। এটি মুবাহ এবং জায়েয। কেননা প্রথার ক্ষেত্রে ইবাহাত তথা বৈধ হওয়াই মূলনীতি (যতক্ষণ পর্যন্ত ‘না- জায়েয’ হওয়ার দলীল পাওয়া না যায়।)
২. ধর্মীয় ক্ষেত্রে উদ্ভাবন: তা হল দ্বীনের মধ্যে কোন বিদআত সৃষ্টি। এটি হারাম। কেননা দ্বীনের ক্ষেত্রে অনুসৃত নীতি হল, তাওকীফী অর্থাৎ পুরোপুরি কুরআন-সুন্নাহের উপর নির্ভরশীল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد.
‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু উদ্ভাবন করবে, যা দ্বীনের অন্তর্গত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত’
من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد.
‘কোন ব্যক্তি যদি এমন কাজ করে যা আমাদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত’
দ্বিতীয়ত: বিদআতের প্রকারভেদ:
দ্বীনের ক্ষেত্রে বিদআত দু’ শ্রেণিতে বিভক্ত:
প্রথম শ্রেণি: কথা ও আক্বীদার ক্ষেত্রে বিদআত। যেমন জাহমিয়া, মুতাযিলা, রাফেযা ও যাবতীয় ভ্রান্ত ফিরকাসমূহের বক্তব্য ও আক্বিদা।
দ্বিতীয় শ্রেণি: ইবাদতের ক্ষেত্রে বিদআত। যেমন এমন পন্থায় আল্লাহর ইবাদাত করা যা তিনি অনুমোদন করেননি।
এটিও কয়েক প্রকার:
প্রথম প্রকার: মৌলিক ইবাদাতের ক্ষেত্রে যে বিদআত হয়ে থাকে। যেমন এমন এক ইবাদাত সৃষ্টি করা, শরিয়াতে যার কোন দলীল নেই। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, এমন এক নামাজ উদ্ভাবন করা যা শরিয়াতে অনুমোদিত নয় কিংবা এমন রোজার প্রচলন যা আসলেই শরিয়তে অননুমোদিত, অথবা শরিয়ত সমর্থিত নয় এমন সব উৎসব যেমন জন্মোৎসব প্রভৃতি পালন করা।
দ্বিতীয় প্রকার: শরিয়তে অনুমোদিত ইবাদাতের ক্ষেত্রে কোন কিছু সংযোজন ও বৃদ্ধি করা। যেমন যোহর কিংবা আসর নামাজে এক রাকাত বাড়িয়ে পাঁচ রাকাত আদায় করা।
তৃতীয় প্রকার: শরিয়ত সিদ্ধ ইবাদাত আদায়ের পদ্ধতিতে যে বিদআত হয়ে থাকে। যেমন শরিয়ত সিদ্ধ নয় এমন পন্থায় তা আদায় করা। এর উদাহরণ হল: শরিয়ত অনুমোদিত যিকর এ দোয়া ইজতেমায়ী ভাবে একই তালে ও সুরে পাঠ করা। অনুরূপভাবে ইবাদাতের ক্ষেত্রে নিজের উপর এমন কঠোরতা আরোপ করা যদ্বরুণ সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত থেকে বের হয়ে যায়।
চতুর্থ প্রকার: শরিয়ত সিদ্ধ ইবাদাতের জন্য শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত নয়, এমন সময় নির্ধারণের মাধ্যমে যে বিদআত করা হয়। যেমন শা’বান মাসের ১৫ তারিখের দিন ও রাতকে রোজা ও নামাজের জন্য নির্ধারিত করা। কেননা রোজা ও নামাজ তো শরিয়ত সিদ্ধ। কিন্তু তাকে কোন এক সময়ের সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য দলীল থাকা চাই।
তৃতীয়ত: সকল শ্রেণি বিভাগসহ দ্বীনের ক্ষেত্রে বিদআতের হুকুম
দ্বীনের ক্ষেত্রে সকল বিদআতই হারাম ও ভ্রষ্টতা। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
وإياكم ومحدثات الأمور، فإن كل محدثة بدعة، وكل بدعة ضلالة.
‘নতুন নতুন বিষয় থেকে তোমরা বেঁচে থাক। কেননা প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেক বেদআত ভ্রষ্টতা’
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد.
‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু উদ্ভাবন করবে যা সে দ্বীনের অন্তর্গত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত’
من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهورد.
‘কোন ব্যক্তি যদি এমন কাজ করে যা আমাদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত’
হাদীস দু’টি দ্বারা প্রমাণিত হল যে, দ্বীনের ক্ষেত্রে নব উদ্ভাবিত সকল পন্থাই বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা ও প্রত্যাখ্যাত। এ কথার অর্থ বিদআত হারাম। তবে বিদআতের শ্রেণি বিভাগ অনুযায়ী হারাম হওয়ার ব্যাপারটি বিভিন্ন স্তরের হয়ে থাকে। কেননা এর মধ্যে কিছু হল স্পষ্ট কুফরি। যেমন কবরবাসীদের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কবরের চারপাশে তাওয়াফ করা এবং জবেহ করা ও মান্নত করা। কবরবাসীদের কাছে দোয়া করা ও সাহায্য চাওয়া। অনুরূপভাবে এতে চরমপন্থী-জাহমিয়া ও মুতাযিলীদের বিভিন্ন বক্তব্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিদআতের মধ্যে রয়েছে যা আক্বীদাগত ফাসেকি বলে পরিগণিত।
যেমন,কথা ও আক্বীদার ক্ষেত্রে খারেজী,ক্বাদারিয়া এবং মুরজিয়াদের বিদআত যা শরিয়তের দলীল সমূহের সরাসরি পরিপন্থী।
কিছু বিদআত এমন রয়েছে যা গুনাহ বলে বিবেচিত।
যেমন, দুনিয়া ত্যাগী হওয়ার বিদআত, রোদে দাঁড়িয়ে রোজা রাখা এবং যৌন কামনা দমনের জন্য অপারেশন করার বিদআত।
No comments:
Post a Comment